পদ্মার ভয়াল থাবা

‘দুই মাসের ব্যবধানে আজ আমরা ঠিকানাহীন’

পদ্মার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে নড়িয়ার বিস্তীর্ণ জনপদ

‘বিশ শতাংশ জায়গার ওপর বড় বাড়ি ছিল। মূলফতগঞ্জ বাজারে দোকান ছিল স্বামী সোহেল মিয়ার। সবই কেড়ে নিয়েছে পদ্মা। দুই মাসের ব্যবধানে ভালো অবস্থান থেকে আজ  আমরা ঠিকানাহীন হয়ে পড়েছি।’—চোখে জল আর সব হারানোর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলছিলেন পূর্ব নড়িয়া গ্রামের সোহেল মিয়ার স্ত্রী সুফিয়া খাতুন।

শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অবস্থা বর্তমানে সুফিয়ার পরিবারের মতোই। সর্বনাশা পদ্মা ওই এলাকার ধনী-গরিব সবাইকে এখন এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে।

পদ্মা তীরবর্তী শরীয়তপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে নদী ভাঙন। এতে সর্বস্বান্ত হয়ে ঠিকানাহীন হচ্ছে হাজারও পরিবার। অব্যাহত ভাঙনে শরীয়তপুরের মানচিত্র ছোট হয়ে আসলেও কার্যকর কোনও পদক্ষেপ কখনওই গ্রহণ করা হয়নি।

পদ্মায় তীব্র ভাঙন

গত ২ জানুয়ারি ‘পদ্মার ডান তীর রক্ষা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাস হলেও এখন পর্যন্ত কোনও কাজ শুরু হয়নি।

এদিকে চলতি বছরের জুন মাস থেকে নড়িয়া এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। সম্প্রতি ভাঙনের তীব্রতা ও ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায়। প্রমত্তা পদ্মার স্রোতের তোড়ে মুহূর্তেই নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন রোধে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা তেমন কোনও কাজে আসছে না।

 

পদ্মায় বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়িজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন মাসে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে চার হাজার ৬৫০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এছাড়া চারটি বাজারের দুইশ'র বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩টি বেসরকারি ক্লিনিক, ৭টি মসজিদ, ১টি মন্দির, এক কিলোমিটার পাকা সড়ক, ৯টি সেতু,১৬টি বহুতল ভবনসহ প্রায় ৮০টি পাকা বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী তীরবর্তী ৩টি বাজার সম্পূর্ণরূপে এবং ১টি বাজার আংশিক বিলীন হয়ে গেছে। গত ৭ আগস্ট সাধুরবাজার লঞ্চঘাট এলাকা নদীতে তলিয়ে গেলে ৯ জন পানিতে ডুবে যায়। এদের মধ্যে একজনের মরদেহ ভেসে উঠলেও অন্যদের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এ মুহূর্তে সবচাইতে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মূলফতগঞ্জ বাজার। হাসপাতাল মসজিদ, গ্যারেজ ও সীমানা প্রাচীর ইতিমধ্যেই নদীতে চলে গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবনের একটি অংশ এখন পানির ওপর ঝুলে রয়েছে। যেকোনও সময় বিশাল ভবনটি ধসে পড়তে পারে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে হাসপাতাল এলাকার বাকি ১১টি ভবনসহ প্রাচীন মূলফতগঞ্জ বাজারের পাঁচশ'র মতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেকোনও সময় নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।

নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মুনীর আহমেদ বলেন, ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের মূল ভবনের কার্যক্রম বন্ধ করে পেছনের একটি আবাসিক ভবনে সাময়িকভাবে তা চালু রাখা হয়েছিল। এখন সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ মালামাল নিকটবর্তী ৩টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

পদ্মার ভয়াল গ্রাস

সরেজমিনে গিয়ে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে পদ্মা তীরবর্তী এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। নড়িয়া পৌরসভার ২ ও ৪নং ওয়ার্ডের অর্ধেকের বেশি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। দুটি ওয়ার্ডে প্রায় ২ হাজার পরিবার বর্তমানে গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ভাঙন কবলিত মানুষ তাদের বসতবাড়ি থেকে যতটুকু সম্ভব মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে মালামাল বহনের জন্য গাড়ি ও শ্রমিকের অভাব রয়েছে, দুই-একজন পাওয়া গেলেও চারশ' টাকার মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার টাকায়। যাদের বাড়িঘর চলে গেছে তারা সাময়িকভাবে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বা ভাড়া বাড়িতে উঠেছেন।

সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কেদারপুর ইউনিয়নে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার বর্তমানে গৃহহীন। ভাঙনে পুরোপুরি বিলীন হওয়া সাধুর বাজার, ওয়াপদা বাজার, বাঁশতলা বাজার এবং আংশিক বিলীন হওয়া দুইশ' বছরের পুরনো মূলফতগঞ্জ বাজার এই কেদারপুর ইউনিয়নে অবস্থিত।

 

পদ্মায় বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি

কেদারপুর গ্রামের বাসিন্দা জানে আলম বলেন, রাতের পর রাত ঘুমাইনি। মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোতলা বাড়িটি মাত্র দুই লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছি। ক্রেতা তার শ্রমিক দিয়ে যতটুকু সম্ভব ভেঙে নিয়ে গেছে।

নড়িয়া পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুল লতিফ বেপারি বলেন, আমার ওয়ার্ডে এক হাজার ২০০ পরিবার ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বা ভাড়া বাসায় উঠেছেন। 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙন কবলিত ৩ হাজার ৫১০টি পরিবারের মাঝে ৩০ কেজি করে চাল, ২ হাজার ৪০০ পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার এবং ৩৫০টি পরিবারের মাঝে ৭০০ বান্ডিল টিন এবং ৬ হাজার করে টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

পদ্মার তীরে ঘরবাড়ি হারানো মানুষের ভিড়

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের বলেন, ভাঙন কবলিত অসহায় মানুষকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ২৬০টি পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে নগদ টাকা, টিন ও চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আরও সহায়তা চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ভাঙন কবলিতদের পুনর্বাসনের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি খাস জমি বরাদ্দের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের জন্য শরীয়তপুরের জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার প্রায় ৯ কিলোমিটার জুড়ে ‘পদ্মার ডান তীর রক্ষা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প গত ২ জানুয়ারি একনেক সভায় পাশ হয়। পদ্মা সেতু থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৯৭ কোটি টাকা। ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে বর্তমানে পদ্মার ভাঙনের তীব্রতা রোধে জুলাই মাসে সাড়ে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ অর্থ ব্যবহার করে ১১ জুলাই থেকে ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা শুরু হয়েছে। এই খাতে নতুন করে আরও ২ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, নদীর পানি না কমা পর্যন্ত তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব না। এ মুহূর্তে ভাঙন রোধ সম্ভব না হলেও বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে তীব্রতা কমানোর চেষ্টা চলছে।