দেওয়ানগঞ্জে প্রকাশ্যে নির্বাচন করে জিতলেন পলাতক আসামি!

ভোট কেন্দ্রে পুলিশের সামনে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত পলাতক আসামি শাকিরুজ্জমামান দেওয়ানগঞ্জের বহুল আলোচিত জোড়া খুনের মামলার প্রধান আসামি বাহাদুরাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শাকিরুজ্জামান রাখাল গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পুলিশের খাতায় পলাতক রয়েছেন। অথচ দীর্ঘদিন জনসম্মুখে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালিয়ে গত বুধবার (৩ অক্টোবর) অনেকটা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয় মেয়াদে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, তার ক্যাডার বাহিনীর হুমকির মুখে বিএনপিসহ অন্য ৩ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্বাচনের আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

এত কিছুর পরেও দেওয়ানগঞ্জ থানার ওসি আমিনুল ইসলাম নিজের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শাকিরুজ্জামান রাখাল হত্যা মামলার আসামি। তবে নির্বাচনী কেন্দ্রে ও অন্য সময় তিনি আমার চোখের সামনে পড়েননি।’

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার রফিকুল ইসলাম জানান, ২০১৬ সালের ২৮ মে পঞ্চম ধাপে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীক নিয়ে শাকিরুজ্জামান রাখাল, ধানের শীষ প্রতীকে সৈইমুদ্দিন, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আনারস প্রতীকে আল আমিন ও ঘোড়া প্রতীক শাহজাহান আলী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হন। নির্বাচন চলাকালে কান্দিরগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খুটারচর এবতেদায়ী মাদ্রাসা কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শাকিরুজ্জামান রাখালের সমর্থক ও ক্যাডার বাহিনী কেন্দ্র দখল ও ব্যালটে সিল মারার চেষ্টা চালান। এ সময় অপর পক্ষের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষে এক ছাত্রসহ চার জন নিহত হন।

ফলে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্র দু’টির ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দেন। অভিযোগ রয়েছে, পরে শাকিরুজ্জামান রাখাল তদবির করে স্থগিত দুই কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৯০৫টি ভোট কেটে এনে তার বাড়ির কাছে পুল্লাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে নতুন কেন্দ্র স্থাপন করেন। পরে বুধবার স্থগিত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা শাকিরুজ্জামান রাখাল নৌকা প্রতীক নিয়ে মোট ৭ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রাথী আল আমীন। তিনি মোট ৪ হাজার ৪৬৬ ভোট পেয়েছেন।

আলোচিত ওই চার খুনের ঘটনায় মোট ৫টি মামলা দায়ের হয়। তার মধ্যে কুতুবের চর গ্রামের আলমগীর ও কান্দিরচর গ্রামের নূর মোহাম্মদ বাদী হয়ে ইউপি চেয়ারম্যান ও বাহাদুরাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শাকিরুজ্জামান রাখালসহ শতাধিক লোকের বিরুদ্ধে জোড়া খুনের মামলা দায়ের করেন। এই দু’টি মামলাসহ খুটারচর এবতেদায়ী মাদরাসা কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আসাদুজ্জামানের দায়ের করা একটিসহ মোট ৫ মামলা এক সঙ্গে তদন্ত করছেন দেওয়ানগঞ্জ থানার এস আই রাজীব চন্দ্র সরকার।

স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান, বিএনপি প্রার্থী সৈমুদ্দিন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রাথী আল আমীন অভিযোগ করেন, জোড়া খুনের মামলার প্রধান আসামি শাকিরুজ্জামান রাখাল গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্বপালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও যোগ দিচ্ছেন। একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন যাপন করছেন। এত কিছুর পরও দেওয়ানগঞ্জ থানা পুলিশের খাতায় ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে তিনি পলাতক! তাকে গ্রেফতার করাতো দূরের কথা উল্টো পুলিশ তাকে সালাম ঠুকছে।

আদালত থেকে জামিন না নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানোর বিষয়ে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শাকিরুজ্জামান রাখাল যে জামিন নেননি তা জানতাম না। তবে অন্তত নির্বাচনে অংশ গ্রহণের আগে আদালত থেকে তার জামিন নেওয়া উচিত ছিল।’

এদিকে পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন পিপিএম বলেন, ‘দেওয়ানগঞ্জ থানার ওসি আমিনুল ইসলাম শাকিরুজ্জামানের বিষয়টি আমাকে অবহিত করেনি। করলে আরও আগেই ওই আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতো।’ তবে শিগগিরই শাকিরুজ্জামানের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।