উত্তরা পশ্চিম থানা: জব্দ আলামতেই রাস্তা দখল

উত্তরা পশ্চিম থানাউত্তরা পশ্চিম থানা ভবনের চার পাশের সড়কে যত্রতত্র পড়ে আছে বিভিন্ন মামলার জব্দকৃত সব গাড়ি। কোনও কোনও গাড়ি রাখা হয়েছে অন্যের বাড়ির সামনেই। এদিকে থানার কাজে ব্যবহৃত সব গাড়ি সড়কেই পার্কিং করা। এতে প্রতিনিয়তই সৃষ্টি হয় যানজটের। আবার থানা ভবনের পার্কিংটুকুও জব্দকৃত মোটর সাইকেল দিয়ে পরিপূর্ণ। থানার নিজস্ব পার্কিং অকল্পনীয়, উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডে একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে চলছে উত্তরা পশ্চিম থানার কার্যক্রম।

২০১২ সালে রাজধানীর উত্তরা মডেল থানা ভেঙে গঠন করা হয় উত্তরা পূর্ব এবং পশ্চিম থানা। উত্তরার ৯টি সেক্টর (৩, ৫, ৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪) নিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানাটি গঠিত। 

১৯ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের মুখেই রয়েছে উত্তরা পশ্চিম থানার একটি বড় সাইনবোর্ড। ছোট-বড় বেশকিছু গাড়ি অকেজো অবস্থায় এই সড়কটিতে ফেলে রাখা হয়েছে। ধুলাবালি জমে এসব গাড়ি ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে। থানা ভবনের ঠিক বিপরীত পাশে রয়েছে মোটর সাইকেল পার্কিং। বেশকিছু মোটরসাইকেল সারি করে রাখা। দেয়ালে লেখা রয়েছে ‘ মোটরসাইকেল বিশ্রাম স্থান’। এই সবই সড়ক দখল করে তৈরি করা। জব্দ আলামতেই রাস্তা দখল

দুপুর সাড়ে ১২ টা। থানার নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্কটি থানার নিচতলায় থাকলেও চোখে পড়বে না। কারণ,জব্দকৃত মোটরসাইকেল রেখে সেটি ঢেকে রাখা হয়েছে। সেটি বন্ধ। থাই অ্যালুমিনিয়াম ও গ্লাস দিয়ে একটি ডেক্স তৈরি করা থাকলেও সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। নিচতলায় দর্শনার্থীদের জন্য বসার ব্যবস্থা রয়েছে। এর সামনেই থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আলমগীর গাজীর বসার কক্ষ। এর পাশে সার্ভিস ডেলিভারি কক্ষ, তবে সেটি ছিল তালাবদ্ধ। সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় গেলে ডান পাশে থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষ। ডিউটি অফিসারের কক্ষের সামনেই রয়েছে থানা হাজতখানা। সেখানে পুরুষ হাজতখানার সামনের অংশে লোহার গ্রিলের একটি বেষ্টনি দিয়ে মহিলা হাজতখানা করা হয়েছে। তার ভেতরে দুইজন আসামিকে দেখা যায়। এদিকে দ্বিতীয় তলার বাম পাশে রয়েছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কক্ষ। এব পাশেই রয়েছে পরিদর্শক (তদন্ত) এর বসার কক্ষ। তারপরের কক্ষটি ওসির বিশ্রামাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভবনের তৃতীয় তলায় থানার সেরেস্তা কক্ষ।   

দুপুর ২টার দিকে থানার দর্শনার্থীদের ওয়েটিং রুমে সোফায় বসা প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী আব্দুস সাত্তার শামসু জানান, 'আমি থান কাপড়ের ব্যবসা করি। গোলাম জাফর (৪৮) নামের এক ব্যক্তি আমাকে থান কাপড় বিক্রয়ের কথা বলে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয়। কিন্তু সে কোনও মাল সাপ্লাই দেয়নি। বেশ কিছুদিন যাবত সে ঘুরাচ্ছে, তাকে ধরা যাচ্ছে না, পাওয়া যাচ্ছে না। আজ টাকা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এখনও পাইনি। যদি টাকা দেয় তবে ভালো, নয়তো থানায় তার নামে অভিযোগ করবো। ওসির সঙ্গে দেখা করবো বলে অপেক্ষা করছি।’ উত্তরা পশ্চিম থানা

এসময় থানায় অপারেশন কক্ষে একটি মেয়েকে নিয়ে প্রবেশ করেন এক নারী পুলিশ সদস্য। বেশ কিছুক্ষণ পরে তাকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় থানার দোতলায়। থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই মেয়েটিকে গত রাতে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের একটি বাসা থেকে ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছিল। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এসময় পরিদর্শক (অপারেশন) একটি মাদকের অভিযানে যায়।

এদিকে, থানার ওসির কক্ষের সামনে বসে থেকে দেখা যায়, একটি সমস্যা নিয়ে বেশি কিছু লোক থানায় এসেছিল। তবে তারা কোনও অনুমতি না নিয়েই ওসির কক্ষে প্রবেশ করছিলেন। তখন ওই কক্ষে ওসি ছিলেন না। তিনি পাশের কক্ষে বিশ্রামাগারে ছিলেন। পরে এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে জানা যায়, তারা উত্তরা এলাকার রাজনৈতিক নেতা। দুইপক্ষে ব্যবসায়িক লেনদেনজনিত কোনও সমস্যা নিয়ে থানায় এসেছিলেন।  

বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে থানার ডিউটি কক্ষ থেকে দুইজন ব্যক্তি বের হয়ে যাচ্ছিলেন, তাদের একজনের মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল। তাদের পিছু পিছু নিচে গিয়ে এর কারণ জানতে চাইলে আহত ব্যক্তি আলাউদ্দিন জানান, ‘মোবাইলে টাকা রিচার্জের ঘটনা নিয়ে দোকানদার আমারে মারধর করেছে। মোবাইলে টাকা আসে না কেন? এর কারণ জানতে গেলেই দোকানি আমাকে মারধর করে। ঘটনাটি ঘটে উত্তরার পাকুড়িয়া মহিলা মাদ্রাসার পাশে একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকানে।

‘পশ্চিম থানায় অভিযোগ করতে এসেছিলাম। কিন্তু, পুলিশরা বলছে, ঘটনাস্থল তাদের থানা এলাকায় নয়, তুরাগ থানায় পড়েছে। তাই আগে মেডিক্যালে যান, পরে ওই থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন। জব্দ আলামতেই রাস্তা দখল

সন্ধ্যা ৬ টার দিকে থানার নিচতলায় দেখা যায় অনেকগুলো কার্টন। দুইজন আসামিকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আসা হয়। এরপর কার্টন খুলতেই দেখা যায় নতুন 'খাট' মাদক এনপিএস। এরপর তারা আবার এই সংশ্লিষ্ট অভিযানে বের হন।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা থানার নিজস্ব ভবন নেই। তিন কাঠা জায়গার ওপর একটি আবাসিক ভবনে খুব কষ্টেই থানা কার্যক্রম চলছে। পুলিশ সদস্যদের জায়গা দেওয়া কষ্ট হয়ে পড়ে। এ কারণে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথে ৮০, ৮২, ৮৪ এই তিনটি প্লট (৩০ কাঠা জায়গা) আমরা চিহ্নিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় থানার নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য বরাদ্দ চেয়েছি। রাজউক যাতে সদয় হয়ে এটি করে সেজন্য আমরা আশা প্রকাশ করছি। 

তিনি বলেন, 'জব্দকৃত গাড়িগুলোও সড়কেই রাখতে হয়। এরজন্য প্রতিদিনই অন্তত ১০ জনের টেলিফোন পেতে হয়। এসব গাড়ি সড়কে রাখার কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। মানুষের বকাঝকা খেতে হচ্ছে।'

কী ধরনের মামলা বা অভিযোগ থানায় আসে জানতে চাইলে ওসি বলেন, প্রতারক সংক্রান্ত অভিযোগ বেশি আসে। মাদক অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। তবে কিছু মাদক মামলাও হয়।   

প্রতারণার একটি সমস্যা নিয়ে দুই পক্ষ আমার কাছে এসেছে। তাদের কিছু সময় দিয়েছি, এর মধ্যে তারা নিজেরা মিটমাট করে নিলে ভালো, নয়তো অভিযোগ নিয়ে সবাইকে থানা হাজতে রাখবো। কারণ, এরা নিজেরাও প্রতারক।

আরও পড়ুন- নিজস্ব ভবন তবু জরাজীর্ণ অবস্থা উত্তরা পূর্ব থানার