বাগমারার তাহেরপুরের প্রাচীন মন্দিরে এবার অষ্টধাতুর প্রতিমা স্থাপন

রাজশাহীর বাগমারার রাজবাড়িতে অষ্টধাতুর প্রতিমা স্থাপন

রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুর প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রচলন করেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরে। ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের ওই দুর্গোৎসবে তিনি ব্যয় করেছিলেন নয় লাখ এক টাকা। ৫৩৭ বছর পর এবার সেখানে দুর্গাপূজার জন্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক।

কংস নারায়ণের রাজবাড়ীতে অবস্থিত মন্দিরটিতে তিনি অষ্টধাতুর একটি প্রতিমা তৈরি করে দিয়েছেন। এক টনের বেশি ওজনের এই প্রতিমাটি তৈরি করতে ২৫ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিমাটি মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) প্রতিমাটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার।

বাগমারা আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক বলেন, রাজা কংস নারায়ণের শারদীয় দুর্গাপূজার প্রকৃত ইতিহাস যুগ-যুগান্তর ধরে যেন মানুষ স্মরণ করে সে উদ্দেশ্য নিয়ে অষ্টধাতু দিয়ে ব্রোঞ্জের প্রতিমাটি আমি নিজ উদ্যোগেই তৈরি করে দিয়েছি। প্রতিমাটির কারণে প্রাচীন এই মন্দিরটি আরও সমৃদ্ধ হলো। মন্দিরের কিছু সংস্কার কাজও করা হচ্ছে। সংস্কার কাজ পুরোপুরি শেষ হলে এটা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটা তীর্থস্থানে পরিণত হতে পারে। মন্দিরটির উন্নয়নে আমি সব সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে আছি।

রাজশাহীর বাগমারায় অষ্টধাতুর প্রতিমা স্থাপন অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার

রাজশাহী জেলা তথ্য বাতায়ন সূত্রে জানা গেছে,মা দুর্গার পৃথিবীতে প্রথম আবির্ভাব স্থল রাজশাহীর তাহেরপুর। মা দুর্গার জন্ম স্বর্গে। ত্রেতাযুগে রাবণের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দশরথ পুত্র মহামতি রাম দুর্গার অকালবোধন পূজা করেন। মা দুর্গা তার পূজায় সন্তুষ্ট হয়ে রাবণ বধের বর প্রদান করেন। সে বর পেয়ে রাম লঙ্কারাজ রাবণকে বধ করতে সক্ষম হন। ৮৮৭ বঙ্গাব্দে (১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে) কংস নারায়ণের আহ্বানে দুর্গা সাধারণ্যে আবির্ভূত হন। শরৎকালে আশ্বিন মাসের মহা ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন হয়। ঐ পূজায় পৌরহিত্য করেছিলেন রাজপণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী। মা দুর্গার প্রথম পদধূলিতে ধন্য এই পুণ্যভূমি। এই পুণ্যভূমি থেকেই শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এরপর থেকেই শরৎকালের দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতবর্ষে। কালের পরিক্রমায় এখন আরও জাকজমকভাবে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন করে আসছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। রাজা কংস নারায়ণ তাহেরপুরে পাশাপাশি চারটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এগুলো হলো গোবিন্দ মন্দির, শিব মন্দির, দূর্গা মাতা মন্দির এবং কালিমন্দির। রাজার বংশধররা ভারতে চলে গেলে ১৯৬৭ সালে রাজবাড়িসহ সব জমি লিজ নিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হয় তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজ। ২০১৩ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মন্দিরটি খুলে দিতে বাধ্য হয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। রাজার নির্মিত সেই চার মন্দিরে এখনও পূজা অর্চনা হচ্ছে।

স্থানীয়দের ধারণা, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এ জমিদারি বংশের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। তবে এ ধারণা ভুল। এর আগেও এ অঞ্চলে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। কিন্তু  অতীতে দুর্গাপূজা সাধারণ মানুষের দ্বারা করা হতো না এবং যেহেতু রাজা কংসনারায়ণ অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গাপূজার আয়োজন করছিলেন সেহেতু এদেশে সিংহবাহিনী দুর্গাপূজা প্রচলনের স্মৃতি তার কৃতিত্বের সঙ্গে জড়িত। তখনকার সময়ে ৯ লাখ এক টাকা ব্যয় করে এ দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। এতো বড় ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করার জন্য আজও  এদেশের মানুষের স্মৃতিতে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন। শুধু ধর্মীয় কারণেই নয়,অন্যান্য জমিদারদের তুলনায় নিজের অবস্থান শ্রেষ্ঠতর করতে,রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করতে এবং কুলীন ব্রাহ্মণদের বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন।

প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদারকে ক্রেস্ট প্রদান

মন্দির কমিটির সদস্য বিজয় চন্দ্র ভট্টাচার্য্য বলেন, তাহেরপুর থেকেই দুর্গাপূজার বিস্তৃতি লাভ করে। তাই আমরা প্রথম দুর্গামন্দির হিসেবে তাহেরপুরের এই মন্দিরকে জাতীয় দুর্গামন্দির ও তীর্থস্থান হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছি। সরকার পদক্ষেপ নিলে এই স্থানটি দেবী দুর্গার প্রথম আবির্ভাবস্থল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তখন এটি বাংলাদেশের জন্যই গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

রাজশাহী জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সহ-সভাপতি অনিল কুমার সরকার বলেন, মন্দিরটিকে জাতীয় দুর্গা মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। আমাদের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক আমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি মন্দিরটিতে ব্রোঞ্জের তৈরি প্রতিমা দিয়েছেন। এটা সারাবছরই মন্দিরে থেকে মন্দিরকে সমৃদ্ধ করবে।