শুক্রবার (২৬ অক্টোবর) আশুলিয়ায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুর চালায় একদল দুর্বৃত্ত। এসময় বাধা দিতে গেলে হামলার শিকার হন ২০১১ সালে র্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন হোসেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মচারী ও গণ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিমনের অভিযোগ, ‘সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে বহিরাগতদের ভিড় দেখে এগিয়ে যাই এবং আমার সহপাঠীদের লাঞ্ছিত হতে দেখি। এসময় প্রতিবাদ করতে গেলে আমাকে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। হামলাকারীদের লাঠির আঘাতে আমার ডান হাত ভেঙে যায়।’
বর্তমানে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন লিমন। গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের চিকিৎসক তারিক ইসলাম জানিয়েছেন, লাঠির আঘাতেই তার হাড় ফেটে গেছে।
শুক্রবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত আশুলিয়ার বাইশমাইল এলাকায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মীদের সঙ্গে একদল দুর্বৃত্তের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকারীরা এ হামলা চালায়। এসময় গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী লিমন হোসেন গুরুতর আহত হন।
লিমন হোসেন বর্তমানে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শনিবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সহপাঠীদের লাঞ্ছিত হতে দেখে বাধা দিতে যাই। এসময় আমাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়া হয়।’ এসময় তার অন্য সহপাঠীদের মারধর করাসহ নারী শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের চিকিৎসক তারিক ইসলাম বলেন, ‘লিমনের হাতের হাড় ফেটে গেছে। লাঠির আঘাতেই তার হাড় ফেটে গেছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত ১২ দিনের ব্যবধানে আশুলিয়া থানায় ৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার সবক’টিতে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় আনা হয়েছে মাছ চুরির অভিযোগ। স্থানীয় লোকজন ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, ওই পাঁচ মামলার বাদী ও তাদের লোকজনই শুক্রবার দফায় দফায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা চালায়। পিএইচএ ভবনে হামলা চালিয়ে কম্পিউটারসহ মূল্যবান জিনিস লুটে নেওয়ারও অভিযোগ করেন তারা।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলমগীর হোসেনের দাবি, ‘পাঁচ মামলার বাদীরা পরিকল্পনা করে হামলা চালায়।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় ব্যক্তিও একই দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকারীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। তারা পরিকল্পনা করেই হামলা চালিয়েছে।
পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান বলেন, ‘পাঁচ জনের মামলাতেই জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। মামলা দায়েরকারীরা পরস্পর যোগসাজশে এই হামলা চালিয়েছে বলে আমি শুনেছি।’
গণস্বাস্থ্যের একাধিক কর্মচারী বলেন, বৃহস্পতিবার (২৫ অক্টোবর) রাতে সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক নাছির উদ্দিন (জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকারী) তার লোকজন নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পিএইচএ ভবনে হামলা চালায়। এসময় তারা ওই ভবনের মূল ফটক ভেঙে দেয়। পরে মূল ফটকের জায়গায় তাদের মালিকানা রয়েছে দাবি করে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান,শুক্রবার ১১টার দিকে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের সামনে মোহাম্মদ আলীর (জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগে প্রথম মামলা দায়েরকারী) লোকজনের সঙ্গে গণ্যস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মচারীদের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা শুরু হয়। এর একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এর কিছু সময় পরই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নাছির বাহিনীর প্রায় দুইশ’ লোক গণস্বাস্থ্যের পিএইচএ ভবনের ভেতরে হামলা চালায়। এসময় নাছিরের লোকজন ওই ভবনের অডিটোরিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও হামলা চালায়। এ সময় তারা ওই ভবনের ভেতর থেকে কম্পিউটার ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নেয়।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘নাছির বাহিনীর লোকজন তাদের মূল ফটক ভেঙে নিয়ে যায়। এ ছাড়া, পিএইচএ ভবনে হামলা চালিয়ে সব কিছু ভেঙে দেয়। অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নিয়ে যায়। এমনকি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বেশ কিছু গাছও তারা কেটে নিয়ে যায়।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘ঘটনার পর পরই বিষয়টি আশুলিয়া থানায় জানানো হয়। কিন্তু পুলিশ আমাদের কোনও সহযোগিতা করেনি।’
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আমার জমিটি বেশ কিছু দিন ধরে গণস্বাস্থ্য দখল করে রেখেছিল। আমি ওই ভবনের মূল ফটক ভেঙে তা উদ্ধার করেছি। তবে পিএইচএ ভবনে হামলা করার অভিযোগ মিথ্যা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মতো অনেকেরই জমি দখল করেছে গণ্যস্বাস্থ্য। যাদের জমি দখল করেছে তারা হামলা চালাতে পারে। তবে হামলাকারীদের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই।’
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিজাউল হক দিপু বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রমাণ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এদিকে, শনিবার দুপুরে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী গণস্বাস্থ্যের পিএইচএ ভবন পরিদর্শন শেষে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনার নিন্দা জানান। লিমনসহ বাকি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’