নাটোর-৪ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ১৮ জন, আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব

নাটোর-৪ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীরাচলনবিল অধ্যুষিত নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত মনোনয়নপ্রত্যাশী ১৮ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগে ৮, বিএনপিতে ৫ এবং অন্যান্য দল থেকে রয়েছেন ৫ জন প্রার্থী। মনোনয়নকে কেন্দ্র করে এই আসনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীর সঙ্গে অন্যান্য প্রার্থীর দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। চলছে অবাঞ্চিত ঘোষণা, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন আর ভোটারদের কাছে প্রতিপক্ষের অপকর্ম তুলে ধরার মতো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি।
অপরদিকে বিএনপির স্থানীয় প্রার্থীদের মধ্যেও বিভেদ রয়েছে। বড় দুই দলের প্রার্থীদের এমন দ্বন্দ্বের সুযোগে ইতোমধ্যেই মাঠে নেমেছেন অন্যান্য দলের প্রার্থীরাও। মোট ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৩ ভোটারের এই আসনে বড়াইগ্রাম উপজেলায় মোট ভোটার ২ লাখ ১২ হাজার ৪১ জন। অপরদিকে গুরুদাসপুর উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৬৯ হাজার ১২ জন।
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে গুরুদাসপুর উপজেলা থেকে নৌকার মনোনয়ন চাচ্ছেন চারজন। তারা হলেন, বর্তমান এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আহম্মদ আলী মোল্লা, কেন্দ্রীয় যুব-মহিলা লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি এবং গুরুদাসপুর পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ নেওয়াজ মোল্লা। অপরদিকে বড়াইগ্রাম উপজেলা থেকে এ আসনে নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রতন সাহা, প্রয়াত এমপি রফিক সরদারের ছেলে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আরিফ উদ্দিন সরকার, কৃষকলীগ নেতা ও জেলা মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াহাব।
এই আসনে বিএনপির পাঁচজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে গুরুদাসপুর উপজেলা থেকে ধানের শীষ প্রতীকের মনোনয়ন চাচ্ছেন দুই জন। তারা হলেন সাবেক এমপি অধ্যাপক মোজাম্মেল হক এবং গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপি সভাপতি আব্দুল আজিজ। বড়াইগ্রাম উপজেলা থেকে এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকের মনোনয়ন প্রত্যাশী দুইজন। তারা হলেন, বড়াইগ্রামের জোনাইল এলাকার বাসিন্দা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট জন গমেজ এবং বড়াইগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল কাদের মিয়া। তবে শেষ পর্যন্ত একমত না হলে এই আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় বিএনপির উত্তরাঞ্চলীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুল।
এছাড়া অন্যান্য দল থেকে এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন, লাঙ্গল প্রতীকে গুরুদাসপুরের প্রার্থী, সাবেক এমপি ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম সরকার, জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মৃধা, বিএনপি জোট থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন জেলা জামায়াতের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন খান, জাসদের (ইনু) জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডিএম আলম এবং কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের গামছা প্রতীকে মনোনয়ন চাইছেন দলের উত্তরবঙ্গের প্রধান সমম্বয়কারী ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শহীদুল ইসলাম মুন্সী।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, ‘দীর্ঘদিন এমপি থাকায় আব্দুল কুদ্দুস দলীয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। দলীয় ও গণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ করে পরিবারতন্ত্র কায়েমের স্বার্থে তিনি তার মেয়ে কুহেলী কুদ্দুস মুক্তিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি দলীয় গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছেমতো নিজ অনুসারীদের দিয়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালিত করতে চান।’

সম্প্রতি বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এমপি আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়, ‘আব্দুল কুদ্দুস এমপি ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। গত ইউপি নির্বাচনে বড়াইগ্রামের গোপালপুর, চান্দাই, মাঝগাঁও ইউনিয়ন ও গুরুদাসপুরের নাজিরপুর ইউনিয়নে নিজ অনুসারী না হওয়ায় প্রকাশ্যে নৌকা প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে এমপির প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির মনোনীত প্রার্থীর পরাজয় ঘটান। এমপি আব্দুল কুদ্দুসের গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দাবি করে বলা হয়, গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে এমপি আব্দুল কুদ্দুস নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নেন।’
এ আসনে এমপি আব্দুল কুদ্দুসের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে নৌকার মনোনয়ন চাইছেন সাবেক  ছাত্রলীগ নেতা আহম্মদ আলী মোল্লা, ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী এবং গুরুদাসপুর পৌর মেয়র, গুরুদাসপুর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শাহ নেওয়াজ মোল্লা। তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি সংবলিত পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার সাঁটানো হলেও এমপির লোকজন তা ছিঁড়ে ফেলেছে বলে দাবি করা হয়। এসব ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনও হয়েছে। অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছে এমপি আব্দুল কুদ্দুসকে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী অভিযোগ করেন, ‘এমপি কুদ্দুসের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় প্রতিনিয়তই মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তার অনুসারীদের দ্বারা নির্যাতন ও মামলা-হামলার শিকার হচ্ছেন।’
মনোনয়নপ্রত্যাশী শাহ নেওয়াজ মোল্লা জানান, ‘দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতা এবং পরিবারতন্ত্রের শাসন কায়েম করতে এমপি আব্দুল কুদ্দুস তার মেয়ে মুক্তিকে সামনে এনেছেন।’ এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কুদ্দুস বা তার পরিবারকে চায় না- উল্লেখ করে তিনি জানান, দল তাকে মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নৌকার বিজয় আনা সম্ভব হবে। এসব বিষয়ে ডা. সিদ্দিুকর রহমান পাটোয়ারী ও শাহনেওয়াজ মোল্লা জানান, ‘এমপি কুদ্দুসকে বাদ দিয়ে যেকোনও প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নৌকা প্রতীক বিজয়ী হবে- তাতে কোনও সন্দেহ নেই।’
তবে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী, বর্তমান এমপি অধ্যাপক কুদ্দুস এমপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন- ‘এ ধরনের অভিযোগ শুধু মিথ্যা তাই নয়, এগুলো রুচিহীন এবং ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতির বর্হিপ্রকাশ। তিনি বলেন, এ আসন থেকে আমি চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। এলাকার লোকজন ভালোবাসে বলেই আমাকে বারবার নির্বাচিত করেছেন।’ যে যাই বলুক আগামী দিনেও তিনি দলের মনোনয়ন পাবেন এবং বিজয়ের বিষয়েও তিনি শতভাগ আশাবাদী।
মনোনয়নপ্রত্যাশী আহম্মদ আলী মোল্লা বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণদেরকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগসহ সকল পর্যায়ের মানুষ নেতৃত্বের পরিবর্তন চেয়ে আমাকেই সমর্থন করছেন।’ তরুণ নেতৃত্ব এখন এলাকার মানুষের সময়ের দাবি উল্লেখ করে তিনি জানান, এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ আমাকে মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করে নাটোর-৪ আসনটি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারবো বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় শিবিরকে আমরা প্রতিরোধ করেছি।ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে আমি মামলার আসামি হয়েছি। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তি করার জন্য আমিই প্রথম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করি। ফলে বিভিন্ন চড়াই-উৎড়াই পাড়ি দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা আমার আছে।’
এলাকার উন্নয়ন ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘চলনবিল অধ্যুষিত এ আসনে মৎস্যখাত উন্নয়ন, স্টেডিয়াম নির্মাণ, সংস্কৃতি চর্চা এবং এলাকার অবহেলিত রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে আমার।’
এদিকে দলীয় মনোনয়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, বড় দল বিধায় পাঁচজন প্রার্থী ধানের শীষের মনোনয়ন চাইতেই পারেন। তবে জনপ্রিয়তা যাচাই করে হাইকমান্ড যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই সকলে কাজ করে ধানের শীষকে বিজয়ী করবে এমন প্রত্যাশা করেন তিনি।