দীপু মনির আসনে চোখ সুজিত রায়ের, ঐক্যফ্রন্টে প্রার্থিতার দৌড়ে গণফোরামও

চাঁদপুর-৩ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। ওপরে (বাম থেকে): ডা. দীপু মনি এমপি, সুজিত রায় নন্দী, নাছির উদ্দিন আহমেদ, রেদওয়ান খান। নিচে, বিএনপির শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, রাশেদা বেগম হীরা, গণফোরামের অ্যাডভোকেট সেলিম আকবর, নাগরিক ঐক্যের অ্যাডভোকেট ফজলুল হক সরকার। (ছবি: ইব্রাহিম রনি)

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চাঁদপুর-৩ আসনে মনোনয়ন পেতে গণসংযোগ ও লবিং-গ্রুপিং চলছে প্রধান সবগুলো দলের মধ্যে। জামায়াত ছাড়া এই আসনে প্রার্থিতার দৌড়ে আছে প্রতিটি বড় দলের একাধিক প্রার্থী। আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ডা. দীপু মনিকে এবার টেক্কা দিতে চান দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী। আলোচনায় আছেন আরও কয়েকজন প্রার্থী। অন্যদিকে, বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী আলোচনায় থাকলেও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের ওপর দলের কর্মী সমর্থকদের সমর্থনের পাল্লা ভারি। বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন,নির্বাচন এবং আন্দোলনের জন্য শতভাগ প্রস্তুত তারা। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হওয়ায় গণফোরামের জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট সেলিম আকবারও আছেন প্রার্থিতার আলোচনায়।

স্থানীয়রা জানান, চাঁদপুর জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনটি সবচে গুরুত্বপূর্ণ। এ আসনে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে চলছে তীব্র গ্রুপিং লবিং। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী তিনজন হলেও আলোচনায় রয়েছেন টানা দুইবারের এমপি ডা. দীপু মনি ও আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দুই প্রভাবশালী নেতা ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি পৃথক পৃথকভাবে পালন করে আসছেন।

মনোনয়নকে কেন্দ্র জেলা আওয়ামী লীগেও এখন দ্বিধাবিভক্তি দেখা যাচ্ছে। জেলা আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ডা. দীপু মনির পক্ষে থাকলেও আরেকটি অংশ অবস্থান নিয়েছে সুজিত রায় নন্দীর পক্ষে। এছাড়া মনোনয়ন চান মৎস্যজীবী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রেদওয়ান খান বোরহান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পৌরমেয়র নাছির উদ্দিন আহমেদ ও জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল।

চাঁদপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আইয়ুব আলী বেপারী বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনে ডা. দীপু মনিকে এ আসনে মনোনয়ন দেওয়ার কারণে আমরা ৩৫ বছর পর জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এ আসনটি উপহার দিতে পেরেছি। ডা. দীপু মনি সেবার নির্বাচিত হওয়ার পর জননেত্রী শেখ হাসিনা তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন। এরপর গত নির্বাচনেও জননেত্রী তার ওপর আস্থা রেখেছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি থাকায় গত ১০ বছরে ডা. দীপু মনি এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। তাই আমরা আশা করি, জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে জননেত্রী শেখ হাসিনা আবারও ডা. দীপু মনিকে মনোনয়ন দেবেন।’

মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরেই এলাকার মানুষের পাশে আছি। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল সেসময় এ আসন থেকে দল আমাকে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু সে নির্বাচন জরুরি অবস্থার কারণে স্থগিত হয়ে যায়। এরপর ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে দলের তৃণমূলের ভোটে আমি প্রথম হই। পরে জননেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন তার পক্ষেই কাজ করেছি। ২০১৪ সালেও জনমত এবং দলের তৃণমূল আমার পক্ষে থাকা সত্ত্বেও আমি মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হই। তারপরও আমি জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এলাকার মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দল সিদ্ধান্ত নেবে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। আশা করি, দল এবার আমার ত্যাগের মূল্যায়ন করবে। আমি নৌকার লোক। নৌকার পক্ষেই সব সময় কাজ করে যাবো।’

এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে বর্তমান এমপি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এলাকার মানুষের যে আকাঙ্ক্ষাগুলো ছিল তা আমরা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের উন্নয়ন এবং জনবান্ধব কার্যক্রমে এলাকার মানুষ অত্যন্ত সন্তুষ্ট। তাদের সঙ্গে আমার যে আত্মিক সম্পর্ক সে সম্পর্ক ইনশাল্লাহ আগামী দিনেও অটুট থাকবে-এটি আমি বিশ্বাস করি। দেশের মানুষ যখনই নৌকায় ভোট দিয়েছে তখনই দেশের উন্নয়ন হয়েছে এবং বড় বড় অর্জনগুলো অর্জিত হয়েছে। আশা করি, চাঁদপুর-৩ নির্বাচনি এলাকার আপামর জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন। আবারও সারাদেশে নৌকার বিজয়ের মধ্য দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা আবারও দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘এলাকার প্রত্যেকের সঙ্গেই আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমার এলাকার মানুষ আবারও আমাকে বিজয়ী করবে।’

এই আসনে আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যবসায়ী রেদওয়ান খান বোরহান। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘জনগণ আমাকে আশান্বিত করেছে। জনগণ মানুষকে নেতা বানায়। বঙ্গবন্ধুর সামান্য কর্মী হিসেবে এটা আমি বিশ্বাস করি। আমি সম্ভাব্য বলে মনে করি না। আমি মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি নির্বাচনি এলাকার মানুষের সেবা করতে চাই। সে জন্যই আমার আয়ের ৫০ ভাগ টাকা এলাকার মানুষের জন্য ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং তা করছিও।’

এদিকে চাঁদপুর-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে শীর্ষে রয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় নেতা শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। বিএনপির দুর্দিনে দলীয় কর্মসূচিগুলো পালন এবং নেতাকর্মীদের পাশে থাকায় জেলার সর্বস্তরের নেতাকর্মীই মানিককে চান। তবে এ আসনে মনোনয়ন দৌড়ে শেখ ফরিদ আহমেদের প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী সাবেক এমপি রাশেদা বেগম হীরা। এছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন সাবেক পৌর চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তফা খান সফরী এবং কেন্দ্রীয় নেতা কামাল উদ্দিন। সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত এ আসনের সাবেক এমপি এস এ সুলতান টিটু আর সাবেক এমপি জিএম ফজলুল হকের নাম তাদের কিছু অনুসারীদের মুখে খানিকটা শোনা গেলেও তারা এখন রাজনীতিতে প্রায় নিষ্ক্রিয়।

তবে সম্প্রতি ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ায় এই আসনের বিএনপি নেতা-কর্মীরা রয়েছেন কিছুটা অনিশ্চয়তায়। ২০ দলীয় জোট এবং ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগিতে এ আসনটি পড়ে গেলে মনোনয়ন চাইবেন জেলা গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সেলিম আকবর, মান্নার নাগরিক ঐক্যের নেতা অ্যাডভোকেট ফজলুল হক সরকার,সাবেক এমপি এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রফেসর আব্দুল্লাহ।

চাঁদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বলেন, চাঁদপুর জেলায় বিএনপি নেতাকর্মীরা নির্বাচন এবং আন্দোলনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। দল যদি নির্বাচনে যায় তাহলে এ আসনে আমি মনোনয়ন প্রত্যাশী। আল্লাহ যদি কবুল করেন আর দল যদি এই দুর্যোগ মুহূর্তে আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে এ আসনটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবো বলে বিশ্বাস করি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যাপারে তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্ট হলো একটি জোট। কাজেই কেন্দ্র নির্ধারণ করবে কে মনোনয়ন পাবে। কেন্দ্র যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই কাজ করবে জেলা বিএনপি।

এলডিপির নেতা সাবেক এমপি প্রফেসর এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমান রাজনীতির যে প্রেক্ষাপট এ ধরনের রাজনীতির সঙ্গে আমি খুব বেশি পরিচিত না। আমরা এখন এদেশের রাজনীতির জন্য আনফিট। তারপরও যদি নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি হয় এবং আমার দল এলডিপি মনোনয়ন দেয় তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে। আমার ডিমান্ড নেই যে আমাকে এমপি হতে হবে।’

চাঁদপুর জেলা গণফোরাম সভাপতি অ্যাডভোকেট সেলিম আকবার বলেন,‘দীর্ঘদিন থেকে দল করি। দল যদি মনোনয়ন দেয় তাহলে নির্বাচন করবো। আর সেটির সম্ভাবনাও আছে।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অনেক উন্নয়ন করেছে আবার বহু দুর্নীতিও করেছে। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। এসব কারণে মানুষের মাঝে অনেক ক্ষোভ রয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে ভোটের মাধ্যমে।’