সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে আত্মনির্ভরশীল সুমন

 

রফিক-উল-হাসান সুমন এ বছর জাতীয় পর্যায়ে সফল আত্মকর্মী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে ‘জাতীয় যুব পুরস্কার ২০১৮’ গ্রহণ করছেনরফিক-উল-হাসান সুমন। একজন আদর্শ কৃষক। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরায় গড়ে তুলেছেন সমন্বিত কৃষি খামার। যেখানে বছরজুড়ে বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি, ফলমূলের পাশাপাশি ফসল ও মাছ চাষের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য বদলেছেন তিনি। এখন এলাকায় তিনি একজন সফল কৃষক। রফিক-উল-হাসান সুমন এ বছর জাতীয় পর্যায়ে সফল আত্মকর্মী হিসেবে ‘জাতীয় যুব পুরস্কার ২০১৮’-তে ভূষিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) জাতীয় যুব দিবসে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তিনি এ পুরস্কার গ্রহণ করেন।

তার সফলতা দেখে অনেকেই এখন গড়ে তুলেছেন ছোট-বড় বেশ কয়েকটি সমন্বিত কৃষি খামার। যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে এলাকার শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর। তার উদ্যোগ ও সাফল্যে গোপালগঞ্জে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সমন্বিত কৃষি খামার। এর ফলে একদিকে যেমন শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে পাওয়া যাচ্ছে বিষমুক্ত নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য।

সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিএ পাস করার পর বহুদিন বেকার ছিলেন। ২০০৮ সালে তার এই পেশায় আসা। এর আগে তিনি একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কিন্তু চাকরিতে তার মন টেকেনি। এলাকায় এসে তিনি স্থানীয় যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেন। এরপর নিজ জমিতে স্বল্প পরিসরে চাষাবাদ শুরু করেন। দিনে দিনে তিনি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। প্রায় ২৫ একর জমিতে তার এই প্রকল্প। তার সাফল্য দেখে এই এলাকায় শতাধিক একর জমিতে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষক।

তার প্রত্যাশা, দেশের শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী চাকরির পেছনে না ছুটে এই পেশায় এলে স্বাধীনভাবে কাজ করে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে সক্ষম হবে। এতে একদিকে যেমন বেকার সমস্যা কমে আসবে। তেমনি দেশের অর্থনীতি হবে শক্তিশালী। তিনি আরও জানান, সরকারি সহযোগিতা পেলে আগামীতে বড় পরিসরে একটি ডেইরি ফার্ম করতে চান। যেখান থেকে প্রায় সব ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করা হবে।

সুমনের সাফল্য প্রসঙ্গে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সায়াদ উদ্দিন আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রফিল-উল-হাসান সুমন এ অঞ্চলের একজন সফল চাষি। তিনি যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ সবার কাছে সফল আত্মকর্মী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন। তার সফলতায় অনেকেই এখন তাকে অনুসরণ করে নিজেদের ভাগ্য বদল করতে এগিয়ে আসছেন।’

‘জাতীয় যুব পুরস্কার ২০১৮’ -এর ক্রেস্ট হাতে রফিক-উল-হক সুমনসুমনকে দেখে অনুপাণিত হওয়া উদ্যোক্তা লিমন সরদার, সাইফুল মৃধা, ফায়েজ খান, সাহেব আলী মোল্লাসহ আরও অনেকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুমন আমাদের এলাকায় একজন শিক্ষিত সফল উদ্যোক্তা। তার সফলতা দেখে আমরা চাকরির পিছনে না ছুটে এখন নিজেরাই স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি। ছোট-বড় বেশ কয়েকটি খামার গড়ে তুলেছি। এখান থেকে লাভবান হয়ে আমরা নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। আমরা সকলেই বিষমুক্ত খাদ্যপণ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিয়ে থাকি। যার কারণে স্থানীয় বাজারসহ রাজধানী ঢাকায়ও আমাদের উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আর আমাদের এই সাফল্যের আদর্শ রফিক-উল-হাসান সুমন।’

এসব খামারে কাজ করে জীবিকা চালান এ অঞ্চলের নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে ভাগ্য ফিরেছে তাদেরও। ফুকরা গ্রামের কৃষি শ্রমিক হান্নান খান, চঞ্চল মোল্লা, আম্বিয়া বেগম, স্বরস্বতী বিশ্বাসসহ অন্য শ্রমিকরা বলেন, ‘আমাদের এই নিচু এলাকায় বছরের অধিকাংশ সময় খুব একটা কাজ থাকে না। যার ফলে বেকার বসে থাকতে হতো। এখন এসব বড় বড় খামার হওয়াতে সারাবছরই এখানে কাজ করতে পারছি। এর ফলে আমাদের রুটি রুজির ব্যবস্থা হয়েছে।’ 

নিজ এলাকার উদ্যোক্তাদের সফলতা দেখে খুশি এলাকাবাসীও। তারা চান এলাকার অন্য বেকার যুবকরাও যুক্ত হোক এই পেশায়। এই এলাকার আজম শেখ,  হান্নান খান, আক্কাস আলী ঠাকুর জানান, এলাকায় বেকার সমস্যাটা অনেক বড় সমস্যা। এর কারণে ছেলেরা নানা বাজে পথে চলে যায়। নেশাগ্রস্ত হয়। তবে, কাজের মধ্যে থাকলে এ সমস্যা খুব একটা থাকে না। এসব সমন্বিত খামার হওয়াতে অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এতে করে দিন দিন বেকার সমস্যা কমছে। এলাকার অর্থনীতিরও উন্নতি হচ্ছে। তারা চান, এ ধরনের প্রকল্প যেন বৃদ্ধি পায়। তাহলে এর সুফল পাবে সারা দেশের মানুষ।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ রসময় মণ্ডল বলেন, ‘চাষি সুমনসহ অন্য চাষিদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই অঞ্চলে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের একটা বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে। আমরা সব সময় তাদের পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আসছি। এ সহযোগিতা সব সময়ই অব্যাহত থাকবে।’