নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ঘটনার ইন্ধনদাতা হিসেবে অভিযুক্ত রুহুল আমিন একসময় ‘হোটেল বয়’ হিসেবে কাজ করতেন। পরে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন তিনি। ২০১১ সালে ৫ নম্বর চরজুবিলী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন রুহুল আমিন। এরপর তিনি এলাকায় অপরাধের রাজত্ব কায়েম করেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে । বনদস্যু ও জলদস্যুদের সংগঠিত করে নিজের নামে গড়ে তোলেন ‘রুহুল আমিন বাহিনী’। এরপর থেকেই নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবিলী ইউনিয়নের গ্রামীণ জনপদে রুহুল আমিন হয়ে ওঠে এক আতঙ্কের নাম।
চরজুবিলীতে সরেজমিনে জানা গেছে, রামগতির চরাঞ্চলের লাঠিয়াল খুরশিদ আলমের ছেলে রুহুল আমিন। খুরশিদ আলমও ছিলেন হত্যা মামলার আসামি। ১৯৮০ সালে বেচু হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছিলেন তিনি।
জানা যায়, রুহুল আমিন ছোটবেলায় হারিছ চৌধুরী বাজারে রাহিন-মাহিন হোটেলে বয়-এর কাজ করতেন। কিছুদিন কাজ করার পর তিনি জেলা শহর মাইজদীর মোবারক মিয়ার বাসায় কাজ নেন। ওই বাসায় কাজ করার পাশাপশি নোয়াখালী ইউনিয়ন হাইস্কুলে পড়ালেখা করে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর সুবর্ণচর উপজেলার পাংখার বাজারে সততা নামে একটি স্থানীয় এনজিওতে চাকরি নেন রুহুল। অভিযোগ রয়েছে, ওই এনজিওর ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে রুহুল আমিন ঢাকায় চলে যান এবং রাজধানীর কাওরান বাজারে পাইকারি সবজি দোকানে কাজ নেন। সেখান থেকেও বেশ মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করে বরিশাল চলে যান। পরে সেখানে অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান নাছেরের সহায়তায় জেলা জজকোর্টে আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। মূলত এসময়ই তিনি নিজ এলাকার লোকজনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ওয়ার্ড সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ২০১১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৫ নম্বর চরজুবিলী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তাকে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক করা হয়।
রুহুলের প্রথম স্ত্রী শিরীন আক্তার জানান, ‘ঘরটি ২০১১ সালে ইউপি সদস্য হওয়ার আগে ঋণ নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। পরে ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই নারী প্রতিবেশীর দাবি, রুহুল আমিন বাহিনীর ভয়ে তারা সবসময় আতঙ্কিত থাকতেন। রুহুলের ভয়ে তারা ঘর থেকে বের হতে পারেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘সরকারি জায়গার ওপর নিজের নামে রয়েছে রুহুল আমিন নগর। সেখানে তিনি সরকারি জায়গা দখল করে দোকান তৈরি করেছেন। রাস্তার ওপর সবুজ বনায়নের বড় বড় গাছগুলো বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এছাড়া, আমিন উল্যা ভুলু ও আবদুল হকের জমি দখল করে এ বছর একটি ব্রিকফিল্ড চালু করেছে রুহুল ।’
তিনি আরও দাবি করেন, ‘এলাকার জায়গা-জমি কেনাবেচা করতে হলে রুহুল বাহিনীর সদস্যরা উভয়পক্ষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে। ভূমিহীনদের খাস জমি বেচাকেনা করতে হলেও তাকে টাকাপয়সা দিতে হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান দাবি করেন, ‘মাদক ব্যবসা করে মাধ্যমে রুহুল লাখ লাখ টাকা আয় করেছে। মাদক বিক্রির জন্য একটি চক্র রয়েছে। ’
সবুজ বনায়নের পাংখার বাজার থেকে একরাম নগর পর্যন্ত রাস্তার গাছ কেটে নেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নোয়াখালী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম ইঊসুফ অভিযোগ স্বীকার করেননি। তিনি বলেন, ‘গত মাসে কিছু গাছ কেটে রাস্তার পাশে ফেলে রাখার পর, আমরা গাছের গুড়িগুলো বিক্রি করে রাজস্বখাতে জমা দিয়েছি।’
তবে রুহুল আমিনের স্ত্রী শিরিন আক্তার স্বামীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার স্বামীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনও ভিত্তি নেই। এসব ষড়যন্ত্র। তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে রুহুল আমিনের ভায়রা আবু সাঈদ বলেন,‘ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে রুহুল আমিন জড়িত নয়। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক এটা রুহুল আমিনও চায়।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডেভাকেট ওমর ফারুক বলেন, ‘রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠছে, এগুলোর সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে দলের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
চর জব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রুহুলের বিরুদ্ধে এ সব অভিযোগ আগে কখনও শুনিনি।’