জেলা কৃষি অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, সিংগাইর উপজেলায় প্রায় ১২০০ হেক্টর জমিতে গাজরের আবাদ হয়েছে। আর হেক্টরপ্রতি ফলন হয়েছে ১৮ থেকে ২০ টন। তথ্যমতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন গাজর। উপযুক্ত আবহাওয়া আর বেলে দোঁআশ মাটির কারণে এ অঞ্চলে গাজার আবাদ সারা দেশের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তবে এ বছর কুয়াশা কম থাকায় গাজর উৎপাদন কিছুটা কমেছে। কুয়াশা গাজর চাষের জন্য বেশ উপকারী বলে জানান কৃষকরা।
উপজেলার জয়মন্ট, বানিয়ারা, কোমলনগর, নীলকেট, নাজিরপুর, ধোনখালপাড়সহ অন্তত ৩০টি গ্রামের মাঠজুড়ে গাজরের আবাদ করেছেন সেখানকার হাজারও কৃষক।
গাজর চাষি ফজলুল হক বলেন, ‘গত ২০ বছর ধরে আমি গাজরের চাষ করে আসছি। আগের তুলনায় বর্তমানে গাজর বীজের দাম অনেক বেড়েছে। তাই গাজরের উৎপাদন খরচও আগের চেয়ে বেড়েছে। বীজের দাম বেশি থাকায় আমি এবার গতবারের তুলনায় দুই বিঘা জমিতে কম আবাদ করেছি। বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব বীজ নির্ধারিত একজন ডিলারের কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে। ডিলার তার ইচ্ছেমতো দামে বীজ বিক্রি করছেন। সরকারিভাবে একাধিক ডিলার থাকলে বীজ দাম কমে কিনতে পারতাম।’
কথা হয় আরেক গাজর চাষি মো. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, আড়াই বিঘা জমিতে এবার গাজর চাষ করেছেন তিনি। প্রতি বিঘায় গাজর চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। কুয়াশা কম থাকায় এ বছর গাজারের ফলন একটু কম হয়েছে। তবে দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। পাইকারিতে প্রতি কেজি গাজর বিক্রি করতে হয়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে। তার ক্ষেতের গাজর পাইকাররা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ঢাকার কাওরান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
আরও কয়েকজন কৃষক জানালেন, গেল বছর এই অঞ্চলের চাষিরা গাজর বিক্রি করে তেমন লাভবান হতে পারেননি। গাজরের বীজের অধিক দামের কারণে তাদের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। এ বছর গাজর বিক্রি করে মোটামুটি ভালো দাম পাচ্ছেন চাষিরা।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে আমদানি করা গাজর বীজ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে তাদের। স্থানীয়ভাবে কোনও আমদানিকারক না থাকায় ডিলাররা তাদের কাছ থেকে বীজের দাম বেশি রাখছেন। সরকারিভাবে বীজের দাম নির্ধারণের দাবি করছেন কৃষকরা।
দুর্গাপুর গ্রামের গাজর চাষি জয়নাল আবেদিন জানান, প্রতিবারের মতো এ বছরও তিনি ৩ বিঘা জমিতে গাজরের আবাদ করেছেন। এতে তার বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। আর প্রতিবিঘা জমির গাজর বিক্রি করতে পারছেন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। তবে বীজের দাম বেশি থাকায় তাদের উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে। তিনি জানান, ‘এ বছর এক কেজি গাজরের বীজ কিনতে হয়েছে ১২ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকায়। অথচ আগের বছরগুলোতে গাজর বীজের দাম ছিল ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা।’
সিংগাইর থেকে গাজর কেনেন বেপারী কহিনুর মিয়া। তিনি জানান, ‘সিংগাইরের বিভিন্ন অঞ্চলের চাষিদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ বিঘা গাজরের ক্ষেত কিনেছি। ক্ষেত থেকে গাজর তুলে তা পানিতে ধোয়া ও পরিবহন খরচ বেশি হচ্ছে। তবে এই অঞ্চলের হাইব্রিড গাজর ঢাকার কাওরান বাজার, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বড় বড় আড়ত ও হাটবাজারে পাঠানো হয়ে থাকে।’
মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা জানান, দেশীয় কোনও গাজরের বীজ নেই। ওরেঞ্জ কিং নামের গাজরের বীজ জাপান থেকে আমদানি করা হয়। এই বীজ উচ্চ ফলনশীল। এছাড়া গাজর আবাদে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গাজর গাছে যেন ছত্রাকের আক্রমণ না হয় সে ব্যাপারে তারা কৃষকদের সতর্ক করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কৃষকদের বীজ, সার ও কীটনাশক ব্যবহারে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকদের গাজর উৎপাদন বেড়েছে। এ বছর সিংগাইরে প্রায় ১২০০ হেক্টর জমিতে গাজরের আবাদ হয়েছে। আর হেক্টরপ্রতি ফলন হয়েছে ১৮ থেকে ২০ টন। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন গাজর।’
ফলন সংগ্রহ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বীজ বপনের তিন মাসের মধ্যে গাজর সংগ্রহের উপযোগী হয়। তবে ভালো ফলন পেতে হলে ১০০ দিনের আগে ফলন তোলা উচিত নয়। পুষ্ট ও ভালো মানের গাজর পেতে হলে বীজ বোনার ১০০ থেকে ১২৫ দিনের মধ্যে ফলন সংগ্রহ করতে হবে। সিংগাইরের কৃষকরা যত্ন নিয়ে গাজর চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।’