গত ৪ জানুয়ারি মিয়ানমারের স্বাধীনতা দিবসে রাখাইনে চারটি পুলিশ পোস্টে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সাত সদস্য নিহত হন। দাবি করা হয়, বৌদ্ধ বিদ্রোহীরা এই হামলা চালিয়েছে। এরপর থেকে সেনাবাহিনী নতুন করে অভিযান শুরু করে। প্রাণভয়ে বৌদ্ধ ও হিন্দু পরিবারগুলো বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে পালিয়ে আসতে শুরু করে।
শাহপরীর দ্বীপ করিডোরে গিয়ে দেখা যায়, দ্বীপের জেটি ও বাঁধের আশপাশ যেসব এলাকা দিয়ে পশুবাহী ট্রলার খালাসের জন্য ভিড় করতো, সেই এলাকা এখন খাঁ খাঁ করছে। লোকজনের আনাগোনাও নেই বললেই চলে। বাঁধের পাশে বসে থাকা আবদু শুক্কুর জানান, ‘আমি যেখানে বসে রয়েছি, কিছুদিন আগেও এটি খুব ব্যস্ত এলাকা ছিল। কিন্তু এখন নিরিবিলি পড়ে আছে। ফলে এখানকার ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের মন্দায় দিন কাটছে। মিয়ানমারে নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় এক মাস ধরে এই করিডোরে কোনও পশু আসছে না। জানি না এই সমস্যার সমাধান হবে কখন। পশু আমদানি বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাজারে মাংসের সংকট তৈরি হয়েছে এবং দাম বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে মাংসের দামও।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা পশু আমদানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুল্লাহ মনির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিয়ানমারে নতুন করে অভিযান শুরু হওয়ায় সে দেশের ব্যবসায়ীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ফলে এক মাস ধরে সে দেশ থেকে টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ করিডোরে পশু আসা বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি স্থলবন্দরে কাঠ আমদানিও বন্ধ রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।’
শুল্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ জানুয়ারি থেকে কক্সবাজারে টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ করিডোরে পশু আমদানির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে এর আগে ১ থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৩ হাজার ৩৯১টি গরু ও ৪৪০টি মহিষ আমদানি থেকে ১৯ লাখ ১৫ হাজার ৫শ’ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে। এরপর মিয়ানমার থেকে এই করিডোরে আর কোনও ধরনের গবাদিপশু বোঝাই ট্রলার আসেনি। এছাড়া টেকনাফ স্থলবন্দরে সীমান্ত বাণিজ্যেও পণ্য আমদানিতে প্রভাব পড়ছে। বন্দরে অন্যান্য পণ্য এলেও কাঠ আমদানি বন্ধ রয়েছে এক মাস ধরে। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসে টেকনাফ স্থলবন্দরে কাঠ আমদানি করে সরকার ২ কোটি ৭২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে।
শুল্ক বিভাগ জানায়, ‘চোরাইপথে গবাদিপশু আসা রোধে ২০০৩ সালে ২৫ মে শাহপরীর দ্বীপ করিডোর চালু করে সরকার। সেখানে প্রতি গরু-মহিষ থেকে ৫০০ এবং ছাগল থেকে ২০০ টাকা হারে রাজস্ব আদায় করা হয়। বিজিবি ও শুল্ক বিভাগের তত্ত্বাবধানে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়। করিডোর প্রতিষ্ঠার পর ১৫ বছর সময় পার হলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেখানে কোনও স্থাপনা গড়ে ওঠেনি।’
মিয়ানমার থেকে পশু আমদানিকারক মোহাম্মদ শরীফ বলেন, ‘দেশের চাহিদা অনুযায়ী মিয়ানমার থেকে পশু আমদানি করা হয়। বর্তমানে সে দেশের সমস্যার ফলে পশু আসছে না। মিয়ানমার থেকে পশু না আসায় আমাদের এখানে পশুর চাহিদা ও দাম বেড়ে গেছে। পশু আমদানির বিষয়ে মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। সে দেশে অবস্থা স্থীতিশীল হলে পশু আমদানি আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে জানান তারা।’
টেকনাফের শুল্ক কর্মকর্তা শংকর কুমার দাস জানান, ‘পশুর করিডোর থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে আসছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে গবাদিপশু আসা বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি স্থলবন্দরেও আসছে না কাঠ। ফলে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট পূরণ নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছি।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আছাদুদ-জামান চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমারে নতুন করে অভিযান শুরু হওয়ায় সে দেশের পশু ব্যবসায়ীরা দৌড়ের ওপর রয়েছেন। ফলে মিয়ানমার থেকে করিডোরে পশু আসা এখন বন্ধ রয়েছে। তবে এটি তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। তবে যদি কেউ পশুর ট্রলার নিয়ে বাংলাদেশ জলসীমানায় ঢুকে পড়ে সেটির সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব বিজিবির। পশু আমদানির বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’