বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, মিয়ানমারের তৎকালীন আরাকান প্রদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে ১৭৮৪ সালে রাখাইনরা এদেশের সমুদ্র উপকূলে বসতি স্থাপন শুরু করে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে ওই সম্প্রদায়টি ওতপ্রোতভাবে মিশে যায়। কালের বিবর্তনে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের পথ মাড়িয়ে রাখাইনরা নিজেদের অস্তিত্বরক্ষায় এদেশের মাটি ও মননের সাথে একাকার হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন গড়ে তুলেছেন। ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেও এদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলিকে এখনো লড়াই করতে হচ্ছে নিজেদের মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষায়।
সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে বরগুনার রাখাইন অধ্যুষিত তালতলীতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্প নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে ছোট পরিসরে চালু করা হয় রাখাইন মাতৃভাষা ও মৌলিক ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র। শিক্ষা কেন্দ্রটিতে স্থানীয় দরিদ্র রাখাইন সম্প্রদায়ের শিশুদের বিনামূল্যে মাতৃভাষাসহ মৌলিক ধর্ম শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় ক্রাথন চিং নামের এক শিক্ষানুরাগীকে সেখানে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। হঠাৎ করে ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে রাখাইন মাতৃভাষা শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষা কেন্দ্রটিতে বর্তমানে ২০জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রাখাইন শিশুরা নিজেদের মাতৃভাষা শেখার পাশাপাশি মৌলিক ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এই কেন্দ্রটি থেকে। অর্থাভাবে এই শিক্ষা কেন্দ্রটি এখন বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায়।
এবিষয়ে রাখাইন মাতৃভাষা ও মৌলিক ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক ক্রাথন চিং বলেন, নিজের উদ্যোগে ১৯৭১ সাল থেকে স্থানীয় রাখাইন শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষা দিয়ে আসছি। আমার এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে উপজেলার ছাতনপাড়া গ্রামে ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ প্রকল্পের অধীনে শিক্ষাকেন্দ্রটি চালু করা হয়। কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর দুই বছর একটানা বেতন ভাতা পেলেও এখন কোন সুবিধাই পাচ্ছি না। খুব কষ্ট করে শিক্ষা কেন্দ্রটি চালাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, রাখাইন মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই।
রাখাইন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা ও ধর্ম মন্ত্রনালয়ের বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যান ট্রাস্টের ট্রাস্টি খে মংলা রাখাইন বলেন, আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল সব সময় আমাদের কোনঠাসা ও দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তিনি বলেন, বরগুনার তালতলীর শিক্ষাকেন্দ্রটি পুনরায় চালু করতে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি আবেদন আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মাতৃভাষাকে বাচিয়ে রাখতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। কেননা স্থানীয় প্রশাসন প্রভাবশালী মহলের যোগসাযোশে আমাদের সব সময় কোনঠাসা করে রাখে।
২০১৩ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির ৭(১) ধারায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার নির্ধারিত নির্দিষ্ট শ্রেনী পর্যন্ত স্ব স্ব মাতৃভাষা শিক্ষার জন্য পাঠ্যপুস্তক তৈরীর কথা বলা হয়। ৫(২) ধারায় প্রাথমিক স্তরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য স্ব স্ব মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহন করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ এর ৩০ ধারা এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) ধারায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্ব স্ব মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের কথা বলা হলেও রাখাইন সম্প্রদায় এখনও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
বরগুনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মসূচিটি কী কারনে বন্ধহয়ে গেছে সেটা আমার জানা নেই। তবে যদি সেটি আবার চালু করার সুযোগ থাকে তাহলে এবিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মাতৃভাষা রক্ষায় শীঘ্রই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।