সম্পত্তির জন্য প্রতিবন্ধী মা’কে নির্যাতনের অভিযোগ

নির্যাতনের শিকার আলেকজান বেগমসম্পত্তি লিখে না দেওয়ায় শারীরিক প্রতিবন্ধী এক মায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তার মেয়েদের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের শিকার ওই মা বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করে কোনও সুরাহা না পেয়ে নিরুপায় হয়ে কুড়িগ্রাম সদর থানায় চার মেয়ে ওমেয়ে জামাইদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রওশন কবির অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পৌর এলাকার মিয়া পাড়ার মৃত আবু বক্করের স্ত্রী আলেকজান বেগম জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার  ৫ কন্যা সন্তান রয়েছে। মেয়েদের সবার বিয়ে হলেও বিধবা এক মেয়েসহ তিনি নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। গত দুই বছর আগে তার স্বামীর মৃত্যু হলে অন্য চার মেয়ে তাদের পৈত্রিক ভিটার অংশ দাবি করে এবং এরই প্রেক্ষিতে একপর্যায়ে ভিটা বাড়ির অংশ সকলের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়। এদিকে আলেকজান বেগমের দেখাশোনা তার তৃতীয় মেয়ে মোমেনা খাতুন করায় তিনি তার নিজের অংশ ওই মেয়েকে লিখে দেন। মায়ের অংশ থেকে বঞ্চিত হয়ে তার অন্য চার মেয়ে ও মেয়ে জামাইরা আলেকজান বেগমের ওপর নানা নির্যাতন শুরু করে এবং অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। এমনকি তাকে মারার জন্যও উদ্যত হয়। এক পর্যায়ে অলেকজানের মেয়েরা ওই ভিটাতে এসে ঘর করে তার থাকার জায়গা ও ঘর দখল করার চেষ্টা করে এবং তার শৈাচাগার ঘিরে নিয়ে বাড়িতে তার বসবাস কষ্টসাধ্য করে তোলে। এমন অবস্থায় মেয়ে ও জামাইদের হাতে যেকোনও সময় জীবন সংহারের আশঙ্কায় তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়েছেন।

সরেজমিন আলেকজান বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চাশোর্ধ আলেকজান তার বা পায়ের প্রতিবন্ধকতায় ভাল করে হাঁটতে পারেন না। তার তৃতীয় মেয়ে মোমেনাসহ তিনি একটি ঘরে বসবাস করছেন। ওই বাড়িতে একটি টিউবয়েল থাকলেও কোনও শৌচাগার নেই। তার ব্যবহারের শৌচাগারটি তার অন্যমেয়েরা ঘিরে নিয়েছে। আলেকজানের বাড়িতে প্রবেশ করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও রাখা হয়নি।

জানতে চাইলে আলেকজান বেগম জানান, জন্মগতভাবে তার একটি পা আকারে কিছুটা ছোট হওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন না।তার পাঁচ মেয়ের মধ্যে তৃতীয় মেয়ে মোমেনা খাতুন বিধবা হওয়ায় সে তার সঙ্গেই থাকে।ওই মেয়ে মেসে রান্নার কাজ করে রোজগার করে তাকে খাওয়ায় ও দেখাশোনা করে।যেহেতু ওই মেয়ে তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিয়েছে সেহেতু তিনি স্বামীর ভিটার সাড়ে ৪ শতাংশ জমির মধ্যে তার প্রাপ্ত শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ জমি ওই মেয়েকে (মোমেনাকে) লিখে দিয়েছেন। এছাড়া মেয়ে মোমেনা খাতুন তার চাচা ও ফুফুদের প্রাপ্ত অংশ কিনে নিয়েছে। এরপর থেকে অন্য চার মেয়ে তাকে নানাভাবে নির্যাতন করছে। তারা তাকে বিভিন্ন সময় মারতে আসে, পাথর দিয়ে ঢিল দেয়, স্যান্ডেল তুলে মারতে উদ্যত হয়। এমন কি তার মাথার চুল ধরে তাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টাও করে।

আলেকজান বেগম বলেন, ‘নিজের পেটের মেয়ে হয়ে তারা আমাকে যে অত্যাচার করছে তা কোনও সৎ মেয়েরাও করে না।তারা আমার পায়খানা প্রস্রাবের জায়গাও ( শৌচাগার) দখল করেছে। আমার চলার রাস্তায় তারা পানি ঢেলে দেয় যেন আমি পড়ে গিয়ে আঘাত পাই। আমি বাড়ি থেকে বের হতে গেলে আমার গায়ে পানি ঢেলে দেয়। এলাকার মানুষ এগিয়ে আসলে তাদেরও তারা হেনস্থা করে।’

ছোট মেয়ে নাজমা বেগম ও তার জামাই হারুন মিলে তাকে কয়েকবার শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে বলেও অভিযোগ করেন আলেকজান। অন্য তিন মেয়ে মরিয়ম বেগম, মর্জিনা খাতুন ও মমতাজ বেগম বিভিন্ন সময় ছোট মেয়ে নাজমার সঙ্গে মিলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং তাকে উচ্ছেদের হুমকি দেয়। তার চার মেয়ে মিলে তাকে সামাজিকভাবে অপদস্তকরাসহ তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে চলছে বলে অভিযোগ করেন আলেকজান।

আলেকজান বেগমের প্রতিবন্ধী নিবন্ধন সনদআলেকজানের অভিযোগের ব্যাপারে তার প্রতিবেশীদের কাছে খোঁজনিয়ে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। আলেকজানের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের বিষয়টি সত্য জানিয়ে তার বাড়ির সামনের দোকানদার ও প্রতিবেশীলোকমান বলেন, ‘এমন  মেয়ে সন্তান আমি কখনও দেখিনি। তারা পেটের সন্তান হয়ে নিজের মাকে এমন অত্যাচার করতে পারে এটা ভাবা যায় না। আমরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেরাও হেনস্থার শিকার হয়েছি।’

অপর প্রতিবেশি প্রতিবেশী  বলেন, ‘বেটি হয়া ( মেয়ে হয়ে) ওরা মায়ের সাথে যে অত্যাচার করে সেটা না দেখলে কাইয়ো  বুঝবার নয় (কেউ বুঝবে না)। বেটি-জামাই হয়া ওমরা মাক ধরি ডাঙবার আইসে (মারতে আসে)।’

একই কথা জানান আলেকজানের অন্যান্য প্রতিবেশীরা।একজন প্রতিবন্ধী মায়ের ওপর মেয়েদের নানা রকম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনে প্রতিবেশিরাও হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। তারা এ ব্যাপারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এদিকে, প্রতিবন্ধী মায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তার দুই মেয়ে মমতাজ ও নাজমা। তারা জানিয়েছেন, তাদের মা কারও প্ররোচনায় তাদের বিরুদ্ধে এমন বানোয়াট অভিযোগ করছেন।আলেকজানের ছোট জামাই হারুনও তার শাশুড়ির ওপর নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ।

আলেকজানের মেয়ে মমতাজ বলেন,‘আমরা মেয়ে হয়ে কেন এমন করবো। এটা আমাদের মা মিথ্যা বলছেন।’ প্রতিবেশিদের স্বাক্ষ্য সম্পর্কে মমতাজ বলেন, ‘তারা কেন বলছেন আমি জানি না।’ আর কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান মমতাজ।

তবে আলেকজানের ছোট মেয়ে নাজমা বেগম তার মা আলেকজানের সাথে বিরোধের কথা স্বীকার করে বলেন,‘ সে মা হয়ে শুধু এক মেয়েকে তার অংশ লিখে দিছে। আমরা এটা নিয়া প্রতিবাদ করলে তার সঙ্গেআমাদের বাক-বিতণ্ডা হইছে।’ মায়ের ওপর নির্যাতন করার বিষয়ে জানতে চাইলে নাজমা জানান, ‘ একদিন মা আমাকে মারতে আসলে নিজেকে বাঁচাতে আমি তার চুল ধরছিলাম।’

এদিকে জায়গা নিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে বিরোধের কথা স্বীকার করলেও নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেছেন আলেকজানের ছোট জামাই হারুন। হারুন বলেন, ‘ তারা ( আলেকজান ও তার মেয়ে মোমেনা) যে জমি আমার চাচা শশুরের কাছ থেকে কিনেছে সেই জায়গায় আমাদের ঘর আছে। এটা ছেড়ে দিলে আর কোনও বিবাদ থাকবে না।’ কেন তাদের জায়গা ছাড়ছেন না, জানতে চাইলে হারুন বলেন,‘ আমরা এটা নিয়ে মিটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। থানায় আমাদের ডেকেছে। আশা করি খুব তাড়াতাড়ি একটা ফয়সালা হয়ে যাবে।’ তবে আলেকজানকে নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেন তিনি।

নিজ সন্তানদের দ্বারা মায়ের নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিন আল পারভেজের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন,‘আমি বিষয়টি জানি না। আমাকে একটি লিখিত অভিযোগ দিলে আমি  আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

আলেকজানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসি রওশন কবির  বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা থানা থেকে পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শককে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছি। অভিযোগকারী মা ও তার মেয়েদের থানায় ডাকা হয়েছে। আশা করছি বিষয়টি সুরাহা হয়ে যাবে।’