লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার সবক’টিতেই কমবেশি তামাকের চাষ হয়। ক্ষতি জেনেও এ জেলার চাষিরা দীর্ঘদিন ধরে তামাকের আবাদ করে আসছেন। চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তামাকে তাদের এত আগ্রহের কারণ মূলত তিনটি। আর এ তিন কারণ হলো– বিনা সুদ ও জামানতে তামাক কোম্পানির ঋণ সুবিধা, সহজ শর্তে বীজ, সার ও কীটনাশক পাওয়া এবং উৎপাদিত তামাক সহজেই প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানিতে বিক্রি করা।
কৃষকরা বলছেন, তামাকের কাজ করতে গিয়ে সবসময় সর্দি, কাশি ও জ্বর লেগেই থাকে। তারা জানেন, তামাক চাষে মাটির উর্বরতা কমে যায়, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির অম্লতা বেড়ে যায়, অন্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস পায়। এরপরও তারা তামাক চাষ করেন।
চাষিদের ভাষ্য, ফল-মূল বা শাক-সবজি চাষে তারা কারও সহযোগিতা পান না। কিন্তু তামাক চাষে কোম্পানিগুলো তাদের বিনা সুদ ও জামানতে ঋণ দেয়; এমনকি সার, বীজ ও কীটনাশকও দেয়। আর তামাক উৎপাদনের পর তারাই এসে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে চাষিদের কোনও লোকসানও হয় না।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার ৪৫টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় মোট ফসলি জমির পরিমাণ ১ লাখ ১০ হাজার ৩৪ হেক্টর। এর মধ্যে একফসলি জমি ৩ হাজার ৫২০ হেক্টর, দুই ফসলি জমি ৬৬ হাজার ৫০ হেক্টর, তিন ফসলি জমি ৩০ হাজার ৩৫৪ হেক্টর ও তিনের বেশি ফসলি জমি ১ হাজার ১১০ হেক্টর। জেলায় মোট কৃষক পরিবার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬৩টি।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে সদর উপজেলায় ৬শ’ হেক্টর জমিতে ভার্জিনিয়া জাতের তামাক, ৭০ হেক্টর জমিতে মতিহরি জাতের তামাক চাষ হয়েছে। পাশের উপজেলা আদিতমারীতে ৪ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে ভার্জিনিয়া জাতের তামাক ও ১ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে মতিহরি জাতের তামাক চাষ করা হয়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলায় ১ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে ভার্জিনিয়া জাতের তামাক, ২২০ হেক্টর জমিতে মতিহরি জাতের তামাক ও ১০০ হেক্টর জমিতে সিসি জাতের তামাক চাষ হয়েছে।
এ সূত্র আরও জানায়, হাতীবান্ধায় ৩৬৫ হেক্টর জমিতে মতিহরি ও ১৯০ হেক্টর জমিতে ভার্জিনিয়া তামাক চাষ হয়েছে। এ ছাড়া পাটগ্রাম উপজেলায় ২শ’ হেক্টর জমিতে ভার্জিনিয়া ও ৩ হাজার ৩৭৫ হেক্টর জমিতে মতিহরি তামাক চাষ হয়েছে। বর্তমানে মাত্রাতিরিক্ত তামাক চাষ হচ্ছে আদিতমারী, পাটগ্রাম ও কালীগঞ্জে।
আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের তালুক হরিদাস এলাকার তামাক চাষি এরশাদ আলী ও তছির উদ্দিন বলেন, আমরা গরিব মানুষ। যতটুকু আমন ধান পাই তা বিক্রি করে অন্য ফসল চাষ করলে কিছুই থাকে না। তাই ক্ষতির কথা জেনেও অনেকটা বাধ্য হয়েই আমরা তামাক চাষ করছি। আমরা যখন ভুট্টা বা সবজি উৎপাদন করি, তখন বাজারে দাম পাই না। যেমন ধানের ন্যায্য দাম কখনও আমরা পাই না। তাই আমরা এসব চাষ করি না। যদি আমরা ভুট্টা, বেগুন, টমেটো, আলু ও শাক-সবজির দাম ঠিকমতো পেতাম, তাহলে এসবই চাষ করতাম; স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি তামাক চাষ করতাম না। একই কথা জানান তামাক চাষি খায়রুজ্জামান, হাফেজ আলী ও মোছা. সেলিনা খাতুন।
চওড়াটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শামীম মিয়া বলেন, ‘তামাক চাষের মৌসুমে স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি খুবই কম হয়। এই অঞ্চলে বিকল্প ফসল না থাকায় ক্ষতিকর দিকগুলো জানার পরও তামাক চাষ ছাড়ছে না কৃষকরা। ধানসহ অন্য ফসলের ন্যায্য বাজারমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা এই তামাক চাষ ছাড়ছেন না।
তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন স্থানে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল। এ তথ্য জানিয়ে উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা খবির উদ্দিন বলেন, ‘তামাক চাষিদের নিরুৎসাহিত করতে আগামী বছর থেকে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা হতে পারে। এই প্রণোদনা চালু হলে তামাক চাষ থেকে কৃষকরা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।’
তামাক নিয়ন্ত্রণ জোটের (আত্মা) সদস্য খোরশেদ আলম সাগর মনে করেন, ‘যদি কৃষি কর্মকর্তা তামাক প্রক্রিয়াজতকরণ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে উপঢৌকন না গ্রহণ করে কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার জন্য যথোপযুক্ত উদ্যোগ নিতেন, তাহলে তামাকের ক্ষতি থেকে সাধারণ মানুষ রক্ষা পেত।’
জানতে চাইলে আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলীনূর রহমান বলেন, ‘প্রতি হেক্টর জমিতে তামাক উৎপাদনে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৬১০ টাকা খরচের বিপরীতে মোট ২ লাখ ৩১ হাজার টাকা আয় হয়। এতে প্রতি হেক্টরে ৮০ হাজার ৩৯ টাকা নিট লাভ হয়। অথচ প্রতি হেক্টরে বাঁধাকপি উৎপাদনে ১ লাখ ১৯ হাজার ২৭০ টাকা খরচের বিপরীতে মোট ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫শ’ টাকা আয় হয়। এতে নিট ২ লাখ ১৮ হাজার ২৩০ টাকা লাভ হয়। প্রতি হেক্টর আলু উৎপাদনে ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৬৫ টাকার বিপরীতে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। এতে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৩৫ টাকা লাভ হয়। প্রতি হেক্টর ভুট্টা উৎপাদনে ৮১ হাজার ৯শ’ টাকা খরচের বিপরীতে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭শ’ টাকা আয় হয়। এতে ৮২ হাজার ৭শ’ টাকা লাভ হয়। তামাকের তুলনায় অন্য ফসলে বেশি লাভ জানার পরও তামাক ক্রয়কারী কিছু প্রতিষ্ঠানের বিনা সুদে আগাম ঋণ দেওয়া ও উৎপাদিত তামাক বিক্রির নিশ্চয়তা দেওয়ায় চাষিরা তামাক ছাড়ছেন না।’
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মাটির স্বাস্থ্য ও পুষ্টিগুণ ঠিক রাখার জন্য তামাক বাদ দিয়ে বিকল্প শস্য চাষের সুপারিশ করা যেতে পারে। যেমন তিন ফসলি জমিতে ভুট্টা-আউশ-রোপা আমন, আলু-ভুট্টা-রোপা আমন, বাঁধাকপি-ভুট্টা-রোপা আমন, ফুলকপি-ভুট্টা-রোপা আমন, টমেটো-আউশ-রোপা আমন, বেগুন-ভুট্টা-রোপা আমন, শাক-সবজি-ভুট্টা-রোপা আমন চাষ করে কৃষকেদের অধিক মুনাফা লাভের সুযোগ রয়েছে।’
তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার জন্য কী কী পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক (ডিডি) বিধু ভূষণ রায় কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বলেন, ‘তামাক শুধু ক্ষতিকরই নয়; মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিও। এজন্য আমরা কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করছি। একই সঙ্গে যারা তামাক চাষের পরিবর্তে অন্য সফল চাষ করছেন, সেসব কৃষককে কৃষি পুনর্বাসনের আওতায় নানা প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।’
লালমনিরহাট সিভিল সার্জন ডা. কাশেম আলী বলেন, ‘কৃষি বিভাগ চাইলেই লালমনিরহাটে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অভিযোগ শোনা যায়, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির কারণে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অথচ প্রতিবছর তামাক সেবনের কারণে অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া, তামাকের কাজে সম্পৃক্ত থাকার কারণে গ্রামের নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সর্দি-কাশি, জ্বর, অ্যালার্জি, যক্ষ্মা ও অ্যাজমার মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’