শুক্রবার ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় তদন্ত করতে আসেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল মাহামুদ ফায়জুল কবির (জেলা ও দায়রা জজ) এবং কমিশনের উপপরিচালক এম রবিউল ইসলাম। পরে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
কমিশনের তদন্ত দল নুসরাত জাহান রাফির দুই বান্ধবী, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী, ঘটনার দিন দায়িত্ব পালনকারী একজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তদন্ত দল নুসরাতের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন।
তদন্ত দলের সদস্যরা জানান, একজন ভালো ক্রিমিনাল সেকশনের আইনজীবী নিয়োগ করে নুসরাতের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতে জেলা জজকে সুপারশি করবেন তারা। এ মামলায় দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে মানবাধিকার কমিশন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলেও তারা নিশ্চিত করেন।
কমিটির এই প্রতিনিধিরা বলেন, ‘উপজেলার উত্তর চরছান্দীয়া ২৭ তারিখের ঘটনায় যদি মাদ্রাসা প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসন আরও সতর্ক হতেন এবং বিষয়টার ওপর গুরুত্ব দিতেন তাহলে হয়তো ৬ তারিখের ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হতো। এই কলঙ্কিত লোকগুলো আমাদের সমাজে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি দিয়ে ঘটনা আড়াল করে রেখেছিল বা সেইভাবে প্রকাশ করতে দেয়নি। যার কারণে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সাক্ষ্য নিতে এসে এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে।’
তারা আরও বলেন, ‘এখানে দুটি ঘটনা, দুই ঘটনায়ই মামলা হয়েছে। মার্চের ২৭ তারিখে একটি ঘটনা আর এপ্রিলের ৬ তারিখের আরেকটি ঘটনা। সাক্ষীরা যা বলেছে এবং আমরাও মনে করছি ২৭ তারিখের ঘটনার জের হিসেবেই ৬ তারিখের ঘটনাটি ঘটেছে। সাক্ষীদের কথায় একটি বিষয় উঠে এসেছে যে ২৭ তারিখে অধ্যক্ষ নুসরাতকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে যায় এবং তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করে। এই ঘটনার পর সে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধবীদের এবং বাড়িতে গিয়ে লোকজনদের বলে। তারা লাটিসোটা নিয়ে আসে এবং প্রিন্সিপ্যালকে নুসরাতের মা বেত দিয়ে ৩/৪ টি আঘাতও করে।’
মানবাধিকার কমিশনের র্কমর্কতারা নুসরাত জাহান রাফির বাড়িতে যান। সেখানে নুসরাতের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়ে বলেন, নুসরাতের মতো আর কোনও মেয়ে যেন এভাবে মারা না যায়।দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে মানবাধিকার কমিশন তাদের পরিবারের পাশে থাকবে।
তারা এসময় আরও বলেন, একজন মানুষের প্রথম এবং প্রধান অধিকার হচ্ছে বেঁচে থাকা। এটাই মানবাধিকার।
থানায় নুসরাতের বক্তব্য গ্রহণের সময় ওসির ভূমিকা বিষয়ে তারা বলেন, ‘একজন মানুষ যখন থানায় বিচার প্রার্থী হন, তখন পুলিশ কর্মকর্তার উচিত তার দায়িত্ব কতটুকু সে ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়া। ওসি যদি ভিকটিমকে হেনস্থা করে থাকেন সে ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।’
উল্লেখ্য নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিল। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা এর আগে তাকে যৌন নিপীড়ন করে বলে অভিযোগ উঠে। এ অভিযোগে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্ন ভাবে নুসরাতের পরিবারতে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যায় নুসরাত। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। তাকে মামলা তুলে নেওয়া কথা বলে ভয় দেখানো হয়। পরে সেখানে বোরকা পরিহিত ৪/৫ ব্যক্তি নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে তার স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখান প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।
সোমবার (৮ এপ্রিল) দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে ঢামেকের ডাক্তাররা জানান, নাজুক শারীরিক অবস্থার কারণে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া সম্ভব না। শনিবার রাতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে নুসরাত মারা যায়।