খুনিকে দেখে রোকসানা বলেছিলেন ‘এতদিন পর?’

রোকসানার ছেলের আহাজারিমুখে মাস্ক লাগানো এবং কালো টি-শার্ট পরা এক লোক পাশের ফ্ল্যাটে এসে জিজ্ঞাসা করেছিল আবুল কাশেমের ফ্ল্যাট কোনটা। দেখিয়ে দিলে দরজায় কলিংবেল টেপে সে। আবুল কাশেমের স্ত্রী রোকসানা দরজা খুলে বলেছিলেন, ‘‘মও এতদিন পর’। এর কিছুক্ষণ পরই রোকসানাকে খুন করে তার ছেলেকে ছুরিকাঘাত করে বাসায় আগুন লাগিয়ে বের হয়ে যায় ওই খুনি। চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানাধীন কোরবানীগঞ্জের বাইন্নাপট্টি এলাকার আল আমিনের মালিকানাধীন ভবনে মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) এই খুনের ঘটনা ঘটে। আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ ধারণা করছে, খুনি ওই পরিবারটির পূর্বপরিচিত এবং পুরনো কোনও আক্রোশেই হয়তো সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।

কালো টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি ছুরিকাঘাত করে রোকসানাকে হত্যা করে বলে জানিয়েছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কাজের বুয়া ইয়াসমিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ঘটনার সময় তিনি ওই ভবনের পঞ্চম তলায় কাজ করছিলেন। এ সময় কালো টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি ওই বাসার দরজায় নক করেন। পরে দরজা খুলে দিলে ওই ব্যক্তি তার কাছে জানতে চেয়েছেন এটা কি আবুল কাশেম ভাইয়ের বাসা। তিনি না বলার পর ওই লোক নিচে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর চারতলায় আবার গেলে দেখেন ওই ব্যক্তিই রোকসানাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে। তখন তার হাতে রক্তাক্ত ছুরি দেখতে পান ইয়াসমিন। দাড়িওয়ালা লোকটার পরনে কালো টি-শার্ট ও প্যান্ট ছিল বলে তিনি জানান।গৃহকর্মী ইয়াসমিন

এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে কোতোয়ালি থানাধীন কোরবানীগঞ্জের বাইন্নাপট্টি এলাকার জনৈক আল আমিনের মালিকানাধীন ভবনে খুন হন রোকসানা। রোকসানা পরিবারের সঙ্গে ওই ভবনের চারতলায় থাকতেন। তিনি খাতুনগঞ্জের গম ব্যবসায়ী আবুল কাশেমের স্ত্রী। তাদের দুই সন্তান রয়েছে। এরমধ্যে আব্দুল আজিজ (১৯) নামে এক ছেলে একইদিন ছুরিকাঘাতে আহত হন।

ইয়াসমিন আরও বলেন, ‘ওপরের তলার বাসার কাজ শেষ করে এ বাসায় ঢুকতেই কালো গেঞ্জি ও প্যান্ট পরা, দাঁড়িওয়ালা এক লোক রক্তমাখা ছুরি হাতে আমাকে ধরে ফেলে। আমি ভয়ে নিজেকে বাসার কাজের বুয়া পরিচয় দিয়ে তার পা ধরে ফেলি। এ সময় আমাকে গালিগালাজ করে ওই ব্যক্তি নিচে বসিয়ে রাখে। পরে ওই ব্যক্তি বিছানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। এ সময় ভাইয়া (আহত আজিজ) বাসায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে তাকে ছুরিকাঘাত করে ওই লোক। পরে ভাইয়া ও আমাকে টেনে বেডরুমে নিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় তিনজনকে পুড়িয়ে মারার কথা বলে এবং রান্নাঘরে গিয়ে কিছু কাপড় ও তুলায় আগুন লাগিয়ে দেয়। আমাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলে তুই মানুষকে বলে দিবি। আমি কাউকে বলবো না কসম করে বলার পর আমাকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।’রোকসানার লাশ

একই ধরনের কথা জানিয়েছেন রোকসানার প্রতিবেশী শাহনাজ হোসাইন। পাঁচতলা ওই ভবনে মোট ৯টি ফ্ল্যাট। রোকসানাদের পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসাইন এমদাদ ও তার স্ত্রী শাহনাজ হোসাইন। 

শাহনাজ হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার কিছুক্ষণ আগে দরজার সামনে ভাবির সঙ্গে আমার কথা হয়। আমি মেয়ের জন্য দরজায় অপেক্ষায় ছিলাম। তখন ভাবি দরজায় এলে তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হয়। পরে ভাবি রান্না করবেন বলে বাসার ভেতরে গিয়ে দরজা লক করে দেন। তখনও আমি মেয়ের জন্য দরজায় অপেক্ষা করছিলাম। এ সময় মুখে মাস্ক পরা এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করেন, এটা কি আবুল কাশেমের ফ্ল্যাট? তখন আমি তাকে দেখিয়ে বলি, পাশেরটা উনাদের ফ্ল্যাট। লোকটা কলিংবেল চাপার পর ভাবি এসে দরজা খোলেন। এর পরপরই আমি আমাদের বাসায় ঢুকে যাই। আমার মেয়েকে টেনে বাসার ভেতরে এনে দরজা লক করার সময় আমি একটা শব্দ শুনি—‘মও এতদিন পর’। দরজা লক করার পর আমি আর কোনও শব্দ পাইনি।’

লোকটা দেখতে কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লোকটা লম্বা, কালো। মুখে একটা কালো মাস্ক ছিল। লোকটার গায়ে কালো টি- শার্ট, গলায় মোড়ানো কাপড় ছিল। পরনে কী ছিল আমি খেয়াল করিনি। তার দিকে সেইভাবে আমি তাকাইনি।’

পাশের ভবনে থাকা প্রতিবেশী যুবক মীর মোজ্জাম্মেল হক শিমুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুপুরে ভাত খেয়ে আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন দেখেছি কালো টি-শার্ট পরা একটা যুবক হাতে ছুরি নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল। তার এক হাতে একটা ছোরা, অন্য হাতে একটা পিস্তল ছিল। পেছনে বেশ কয়েকজন লোক তাকে ধাওয়া করছে। ধাওয়া করে একজন তাকে ধরলে সে ওই লোককে ছুরিকাঘাত করে। এরপর আর কেউ তাকে ধরতে এগিয়ে আসেনি। পরে সে পালিয়ে যায়। তার কাঁধে দুটি কালো ব্যাগ ছিল।’এই বাড়িতেই সংঘটিত হয় হত্যাকাণ্ড

এদিকে, প্রতিবেশীরা রোকসানা খুনের পেছনে কালো টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি জড়িত বলে জানালেও এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা সেখানে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেন। খুনি বাসার আলমারি ও বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করে রেখে যায়।

ঘটনাস্থলে যান নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) নোবেল চাকমা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোকসানার গায়ে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে আসামি ক্ষোভ থেকে তাকে ছুরিকাঘাত করেছে। আমাদের ধারণা, খুনি তাদের পূর্বপরিচিত। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। আসামিকে শনাক্ত করতে আমরা কাজ করছি।’

নিহত রোকসানার স্বামী আবুল কাশেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দুই সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে কয়েক বছর ধরে এই বাসায় আছি। কারও সঙ্গে আমার শত্রুতা নেই। তবে আমার ভাগ্নের বিয়ে নিয়ে একটা ঝমেলা আছে। আমিসহ সবাই একমত হয়ে আমার ভাগ্নেকে বিয়ে করাই। বিয়েতে ২০ লাখ টাকা কাবিন ধার্য করা হয়। পরে তাদের দুইজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিয়ে ভেঙে যায়। এ ঘটনায় মেয়ে পক্ষ মামলা করে। ওই মামলায় আমাকে ও আমার ছেলেকেও আসামি করা হয়। পরে পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট থেকে আমাদের নাম বাদ দেয়। খুনের পেছনে এ ঘটনার কোনও রেশ থাকতে পারে বলে ধারণা করছি।’

ঘরে কী কী ছিল জানতে চাইলে আবুল কাশেম বলেন, ‘আমার স্ত্রীর ১৫ ভরি গহনা, নগদ কিছু টাকা ও ১০ ধরনের পণ্যের এলসি’র কাগজপত্র ছিল। এগুলো আছে কিনা আমি নিশ্চিত নই। ওই কক্ষে পুলিশ এখনও আমাকে যেতে দেয়নি।’

আরও পড়ুন- চট্টগ্রামে ঘরে ঢুকে ছুরিকাঘাত: মায়ের মৃত্যু, ছেলে আহত