দলের ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত বগুড়ায় বিএনপি এখন অভিভাবকহীন। নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় পাল্টাপাল্টি কমিটি ঘোষণা, মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সংগঠন থেকে বহিষ্কার, সাধারণ সম্পাদক খুন, শহর বিএনপি সভাপতি জেলে ও সাধারণ সম্পাদকের ঢাকায় অবস্থান, উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় জেলা ও উপজেলার ৩০ নেতাকর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির সাধারণ সদস্য পদও কেড়ে নেওয়ার মতো একের পর এক ঘটনায় অস্থির জেলা বিএনপি। বগুড়ায় দলের প্রায় সব ধরনের কমিটি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে। কাণ্ডারিবিহীন বিএনপিতে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনও শক্ত হাত না থাকায় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আগামী ২৪ জুন সদর আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির কেউ অংশ না নিলে খালেদা জিয়ার আসনটি দলের হাতছাড়া হবে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা এ অচলাবস্থা নিরসনে অবিলম্বে কমিটিগুলো পুনর্গঠন করতে কেন্দ্রের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি গঠিত বগুড়া জেলা বিএনপির কমিটি অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এর কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব নিয়ে অনেকদিন গ্রুপিংয়ের গুঞ্জন শোনা গেলেও সম্প্রতি তা প্রকাশ্য রূপ নেয়। একদিকে জেলা বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলাম এবং অন্যদিকে সাবেক এমপি ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু। যারা নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হবেন না এমন মুরুব্বি নেতাদের মাধ্যমে ১০ দিনের মধ্যে আহ্বায়ক কমিটির তালিকা কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ ছিল। তবে সাইফুল গ্রুপ গত ২৯ এপ্রিল দুপুরে শহরের নবাববাড়ি সড়কে দলীয় কার্যালয়ে নির্বাহী কমিটির সাধারণ সভা ডেকে সদ্য সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলামকে আহ্বায়ক ও সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন চাঁনকে সদস্য সচিব করে ৪৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা দেয়। লালু গ্রুপ ওই সভা বয়কট করে। তারা ওপরের নির্দেশ মেনে ওইদিন সন্ধ্যায় শহরের সূত্রাপুরে তারেক রহমানের বাসভবনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট একেএম মাহবুবর রহমানকে আহ্বায়ক ও সাবেক সহসভাপতি ফজলুল বারী তালুকদার বেলালসহ চার জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ৩১ সদস্যের পাল্টা আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা দেয়। দুই গ্রুপের নেতারা নিজেদের কমিটিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্দেশিত ও অপর কমিটিকে এখতিয়ারবিহীন ও অবৈধ বলে দাবি করেন। এ ঘটনায় বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। সাইফুল গ্রুপের নেতাকর্মীরা শহরে নবাববাড়ি সড়কে দলীয় কার্যালয়ে এবং লালু গ্রুপ শহরের সূত্রাপুর রিয়াজ কাজী লেনে তারেক রহমানের বাসভবনে ভিড় করেন।
এর আগে কেন্দ্রীয় সভায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করায় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক বিজ্ঞপ্তিতে সাইফুল ইসলামের সমর্থক বিলুপ্ত জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাস ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক শাহ মেহেদী হাসান হিমুর দলীয় পদ স্থগিত করেন। এর প্রতিবাদে ২৫ এপ্রিল রাতে সাইফুল অনুসারীরা জেলা বিএনপির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। তারা সাবেক এমপি সিরাজের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। এ অপরাধে ওই দুই নেতাকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ থেকে অব্যাহতি এবং সাইফুল ইসলামকে শোকজ করা হয়। কেন্দ্রের চাপে ২২ ঘণ্টা পর ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় সাইফুল ইসলাম তার অনুসারীদের নিয়ে কার্যালয়ের তালা খুলে দেন। এমন পরিস্থিতিতে সর্বশেষ গত ৪ মে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করেন। ফলে গত কয়েকদিন ধরে জেলা বিএনপি নেতৃত্বহীন অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে দলীয় নির্দেশ অমান্য করে গত ১৮ মার্চ বগুড়া সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেলকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৪ এপ্রিল রাতে নিশিন্দারা উপশহর বাজারে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে খুন হন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম শাহীন। শহর বিএনপির কার্যক্রম ছিল না বললেই চলে। সভাপতি মাহবুবর রহমান বকুল নাশকতা ও পুলিশের ওপর হামলা মামলার ওয়ারেন্টে গত ২৮ এপ্রিল রাতে গ্রেফতার হন। তিনি এখনও জেলে আছেন।
এদিকে মায়ের অসুস্থতাসহ নানা কারণে সাধারণ সম্পাদক হামিদুল হক চৌধুরী হিরু বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অন্য দলের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া ও অংশ নেওয়ায় শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলম, শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল বাশার, সদর উপজেলা মহিলা দলের সভানেত্রী নাজমা আকতার, শিবগঞ্জ উপজেলা মহিলা দলের সভানেত্রী বিউটি খাতুনসহ ৩০ নেতাকর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এসব কমিটি প্রায় নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। তাই সবমিলিয়ে বগুড়া জেলা, শহর, সদর থানা বিএনপি ও অন্যান্য কমিটি নেতৃত্বহীন ও অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় বগুড়া-৬ (সদর) আসনে আগামী ২৪ জুন উপনির্বাচন হবে। সেখানে বিএনপি প্রার্থী না দিলে আবারও খালেদা জিয়ার আসনটি হাতছাড়া হয়ে যাবে। বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা অবিলম্বে সংকটগুলো নিরসন করতে হাইকমান্ডের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অন্যথায় বগুড়াকে আর বিএনপির ঘাঁটি বলা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বিলুপ্ত বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন চাঁন বলেন, ‘বগুড়ায় বিএনপিকে অভিভাবকহীন বলা ঠিক হবে না। দায়িত্ব না থাকলেও অনেকে শ্রদ্ধা রেখে কাজ করছেন। গত ৬ মে খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়েছে। তবে কমিটিগুলো না থাকায় সাময়িক সমস্যা হচ্ছে, যা নিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান চিন্তাভাবনা করছেন। তিনি দ্রুত এসবের সমাধান করে দেবেন। তখন আর বগুড়া বিএনপি অভিভাবকহীন মনে হবে না।’
এ প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, ‘কাজ চলছে। ঈদুল ফিতরের আগেই বগুড়া জেলা আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দেওয়া হবে। এরপরই অন্যান্য কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন আমরা মানি না। তাই মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া বগুড়া সদর আসনে আগামী ২৪ জুন উপনির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়নি।’