কারাগারে অমিত মুহুরিকে হত্যা: যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ

অমিত মুহুরি

কারাগারে শীর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরি খুনের ঘটনায় বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অমিতকে খুন করা হয়েছে কিনা, হত্যাকারী রিপন নাথের সঙ্গে অমিতের কোনও পূর্ব শত্রুতা ছিল কিনা, না থাকলে রিপন কেন অমিতকে হত্যা করলো, কারাগারে সেলের ভেতর ইট থাকার কথা না থাকলেও সেখানে ইট কীভাবে গেল, কেন ঘটনার দিনই সেল পরিবর্তন করে রিপনকে অমিতের সেলে আনা হলো−এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তারা।

গত বুধবার (২৯ মে) রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অমিতকে গুরুতর আহতাবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। রাত ১টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। এ ঘটনায় পরদিন (৩০ মে) কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার নাশির আহমেদ। ওই মামলায় তদন্ত কাজ শুরু করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুক্রবার দায়িত্ব পাওয়ার পর আমরা অমিত মুহুরি হত্যা মামলার তদন্তের কাজ শুরু করেছি। আসামি রিপন নাথকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আসামি ইট দিয়ে অমিত মুহুরিকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছে। কিন্তু কী কারণে তাকে হত্যা করেছে, সে ব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হয়নি। আমরা রিপন নাথকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছি। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ জানা যাবে।’ পূর্ব পরিকল্পনা করে হত্যা, পূর্ব শত্রুতা, অন্য কারও সহযোগিতা বা ইন্ধনে হত্যার মতো কয়েকটি প্রশ্ন মাথায় রেখে কাজ করছেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

রিপন নাথের কোনও রাজনৈতিক পরিচয় পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা খোঁজ নিয়েছি, তার কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তারপরও এ বিষয়ে আমরা আরও খোঁজ খবর নিচ্ছি।’

রিপন নাথ পহাড়াতলী থানাধীন সাগরিকা এলাকায় অবস্থিত অর্গানিক জিন্স নামে একটি পোশাক পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিল। অশোভন আচরণের জন্য তাকে কারখানা থেকে বরখাস্ত করার পর সে ছুরি নিয়ে ওই কারখানায় প্রবেশ করলে কারাখানা কর্তৃপক্ষ তাকে গত ১০ এপ্রিল পুলিশে সোপর্দ করে। পরে ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ঘটনার দিন (২৯ মে) বিকালে তাকে কারাগারের ৩২ নম্বর সেলের ৬ নম্বর কক্ষে স্থানান্তর করা হয়। রাতে ওই কক্ষেই ইট দিয়ে আঘাত করে অমিত মুহুরিকে হত্যা করে রিপন নাথ। ওই কক্ষে বেলাল নামে আরেক কয়েদিও ছিল।

ঘটনার দিন বিকালে রিপন নাথকে ৩২ নম্বর সেলের ৬ নম্বর কক্ষে পাঠানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাকে কেন ওই কক্ষে পাঠানো হয়েছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অমিত মুহুরির পরিবার।

অমিত মুহুরির বাবা অরুণ মুহুরি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাকে মেরে ফেলতেই রিপন নাথকে ওই কক্ষে পাঠানো হয়েছে। কারাগার থেকে বের হওয়া কয়েকজন আমাকে জানিয়েছে, রিপনকে ওই কক্ষে পাঠানোর বিষয়ে অমিত প্রতিবাদ করেছিল। এরপরও তাকে ওই কক্ষে পাঠানো হয়েছে। ছুরি নিয়ে ধরা পড়া একজন আসামিকে ওই সেলে পাঠানোর কথাও না। তারপরও কেন তাকে পাঠানো হলো, আমি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এর জবাব চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘কারাগার একটি নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে থাকে। সেখানে মানুষ কীভাবে খুন হবে। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে ইট দিয়ে অমিতকে হত্যা করা হয়েছে। ওই ইট রিপন নাথ কোথায় পেল। এ ঘটনার সঙ্গে কারা কর্তৃপক্ষও জড়িত। কোটি টাকার বিনিময়ে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।’

শুধু ইট নয়, ছুরি দিয়ে অমিত মুহুরিকে জখম করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। অরুণ মুহুরি বলেন, ‘আমার ছেলেকে শুধু ইট দিয়ে হত্যা করা হয়নি। তার শরীরে ছুরিকাঘাতেরও চিহ্ন ছিল।’

তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার নাশির আহমেদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অমিত মুহুরিকে ইট দিয়েই জখম করে হত্যা করা হয়। অমিত মুহুরি যেই কক্ষে ছিল একই কক্ষে আসামি রিপন নাথ ছাড়া বেলাল নামে আরও এক কয়েদি জানিয়েছে, সে ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ অমিতের চিৎকার শুনে সে ঘুম থেকে জেগে দেখে রিপন ইট দিয়ে অমিতকে মারছে। এ সময় বেলাল চিৎকার শুরু করলে দুই কারা প্রহরী গিয়ে অমিতকে উদ্ধার করে। পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।’

একজন দাগী আসামির কক্ষে কেন ছুরি নিয়ে গ্রেফতার হওয়া একজনকে পাঠানো হলো, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাধারণত দাগী আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সেলে সাধারণ কয়েদিদের রাখা হয় না। রিপন নাথকে ওই সেলে পাঠানোর বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। তাকে কেন ওই সেলে পাঠানো হয়েছে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। এ ঘটনায় আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তারা বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখছে।’

মৃত্যু সনদে অমিত মুহুরির মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘সিভিয়ার হেড ইনজুরি, এক্সিডেন্টাল ইনজুরির’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুরতহাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘দুই চোখ বন্ধ, মুখ সামান্য খোলা, দুই কানে ও নাকে রক্তের দাগ আছে। মুখের ডানপাশে দাড়ি ও গোঁফ আছে। বাম পাশেরটা কামানো। বুক-পেট-পিঠ স্বাভাবিক। দুই পা লম্বালম্বি স্বাভাবিক ছিল।’

অমিত মুহুরি নগরের সিআরবির জোড়া খুনের মামলার আসামি। রাউজান পৌরসভার রেজাউল করীমের ছেলে ইমরানুল করিম ইমন হত্যা মামলায় ২০১৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর পুলিশ তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে। এরপর থেকে দীর্ঘ দুই বছর অমিত মুহুরি কারাগারে ছিল।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১৩ আগস্ট নগরীর কোতোয়ালি থানার এনায়েত বাজার রানীর দিঘি থেকে সিমেন্ট ঢালাই করা ড্রামের ভেতর থেকে এক অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহত যুবক রাউজান পৌরসভার রেজাউল করীমের ছেলে ইমরানুল করিম ইমন (২৬)। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৩০ আগস্ট পুলিশ শফিক ও শিশির নামে দুই জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পর জানতে পারে নিজের স্ত্রীর চৈতীর সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক রয়েছে, এ সন্দেহ থেকে ৮ আগস্ট রাতে বাল্যবন্ধু ইমনকে নগরীর নন্দনকাননে নিজ বাসায় ডেকে নিয়ে যায় যুবলীগ কর্মী অমিত মুহুরি। সেখানে রাতভর নির্যাতনের পর ভোরে দিকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করে লাশ ড্রামে ঢুকিয়ে রাখে। তিন দিন লাশটি বাথরুমে রেখে ১২ আগস্ট গভীর রাতে পার্শ্ববর্তী রানীর দিঘিতে ড্রামটি ফেলে দেয়।

আরও পড়ুন- 

কারাগারে অমিত মুহুরি হত্যার ঘটনায় মামলা
কারাগারে সংঘর্ষে হত্যা মামলার আসামি অমিত মুহুরি নিহত