শুনানির তারিখ বারবার পেছানোর কারণে এ মামলার বিচার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আগামী ৬ জুলাইয়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
এ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াছ কুরুনী লকেট মামলার চার্জ গঠনের শুনানির তারিখ পেছানো ও পরবর্তী দিন ধার্যের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘৩৪ নম্বর আসামি আরশাদ আলী ভুঁইয়া উচ্চ আদালতের জামিনে থাকলেও মাদক মামলায় গত ৩ জুন শাহজাদপুর থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেলা কারাগারে আছেন। কারাগারে প্রডাকশন ওয়ারেন্ট দিয়ে তাকে ধার্যকৃত দিনে আদালতে হাজির করা হয়নি। সব আসামি উপস্থিত না থাকায় শেষ পর্যন্ত চার্জ গঠন শুনানি সম্পন্ন হয়নি। এজন্য বিজ্ঞ বিচারক চার্জ গঠনের শুনানির তারিখ আবারও পিছিয়ে দেন।’
এদিকে, জেলা ও দায়রা জজ এবং অতিরিক্ত প্রথম ও দ্বিতীয় জেলা দায়রা জজ আদালতে গত দেড় বছরে এ মামলার চার্জ গঠনের শুনানির প্রক্রিয়া এই নিয়ে সাতবার পিছিয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। মামলাটি বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে থাকলেও বদলিজনিত কারণে বিচারক না থাকায় এটি প্রথম আদালতেই বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, আলোচিত এ মামলার বিচার ও নিষ্পত্তির আগে আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে গত দেড় বছরে চার্জ গঠন না হওয়ায় হতাশ মামলার বাদী শিমুলের স্ত্রী বেগম নুরন্নাহারসহ স্বজনরা। মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের প্রতিশ্রুতিটিও এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়ার অনুমতির জন্য জেলা প্রশাসকের সুপারিশপত্রটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেড় বছরে জবাব আসেনি। অজ্ঞাত কারণে সেটি ঝুলে আছে। মামলার প্রধান আসামি শাহজাদপুর পৌরসভার সাময়িক বহিষ্কৃত মেয়র হালিমুল হক মিরু জেলা কারাগারে থাকলেও বাকি ৩৭ জন উচ্চ আদালতের মাধ্যমে জামিন পেয়ে প্রকাশ্যে শাহজাদপুরে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মামলার বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত করাসহ বাদী ও শিমুলের স্বজনদের তারা নানাভাবে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন, এমন অভিযোগও রয়েছে শিমুলের স্বজনদের।
মামলার বাদী শিমুলপত্নীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের (ক্রিমিনাল পিটিশিন ফর লিভ-টু-আপিল নম্বর ১৩৯২/২০১৮) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার বিজ্ঞ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার বিচার ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া আগামী ৬ জুলাইয়ের মধ্যে সম্পন্ন করায় আদেশ থাকলেও আসামিদের চার্জ গঠনই সম্পন্ন হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় গত ৬ জানুয়ারি হলেও তা ইস্যু হয় ২৩ মার্চ। সুপ্রিম কোর্ট থেকে সেটি পাঠানোর পর সিরাজগঞ্জ জেলা জজ আদালতে গত ১ এপ্রিল রিসিভ করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের রায় নিম্ন আদালতে পৌঁছতে তিন মাস কালবিলম্ব নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন শিমুল স্বজনরা।
প্রসঙ্গত, শাহজাদপুর উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি বিজয় মাহমুদকে অপহরণের পর মিরুর বাড়িতে আটকে রেখে তার দুই সহোদর কর্তৃক মারপিটের ঘটনায় ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে বাঁধে। ওই সংঘর্ষে পেশাগত দায়িত্ব পালনে গিয়ে মিরুর গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি মারা যান সাংবাদিক শিমুল। ওই ঘটনায় মিরু ও তার সহোদর মিন্টুসহ ৪০ জনকে আসামি করে দণ্ডবিধি ১৪৩/৩২৩/৩০৭/৩০২/৩৪ ধারায় একই দিনে শাহজাদপুর থানায় মামলা করেন শিমুলের স্ত্রী। মামলা দায়েরের পুলিশ তিন মাস পর ২ মে শাহজাদপুর আমলি আদালতে ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দাখিল করেন। ২০১৮ সালের ২২ জানুয়ারি এ মামলার বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য শাহজাদপুর আমলি আদালত থেকে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর হয়। প্রেরণের তিন দিন পর ২৫ জানুয়ারি ওই আদালতে এ মামলটি আমলে নেওয়া হয়। মামলাটি আমলে নেওয়ার পর একই আদালতে গত ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে চার্জ গঠনের শুনানির দিন ধার্য করা হয়। এরপর একে একে পেছায় আরও ছয় বার।
অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (দ্বিতীয়) আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট শামসুল হক বলেন, ‘এ মামলার বিচার ও নিষ্পত্তি আগামী ৬ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির বিষয়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনা বিচারকগণ এরই মধ্যে অবগত হয়েছেন। আদেশ যেদিন হোক না কেন, সিরাজগঞ্জে ১ এপ্রিল রিসিভ করা হয়েছে। সেদিন থেকে ছয় মাসের সময় গণনা করা হবে।’
সরকারি পিপি অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান পিপি বলেন, ‘সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এ মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের অনুমতিপ্রাপ্তিতে নথিপত্র পাঠানো হলেও অনুমতি আসেনি।’