চার দশকের বেশি সময় আগে হারিয়ে যাওয়া বাবা-মাকে খুঁজতে এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে এসেছিলেন রওফা। বাংলাদেশে তাকে সহায়তাকারী ‘ইনফ্যান্টস ডু মনডে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর রাকিব আহসান জানান, ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান রওফা। তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। এরপর ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চিলমারী উপজেলার বেসরকারি শিশু সংগঠন ছিন্নমুকুল-এর একটি লঙ্গরখানায় স্থান হয় তার। সেখান থেকে সুইজারল্যান্ডের এক দম্পতি দত্তক হিসেবে নিয়ে যান তাকে। তারপর জেনেভা শহরে বেড়ে ওঠেন রওফা। লেখাপড়া শেষ করে পেশায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এক সুইস নাগরিককে বিয়েও করেন রওফা। তিনি নিজে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে অঙ্কনের শিক্ষক ছিলেন।
রাকিব আহসান আরও জানান, সুইজারল্যান্ডে নিজের পরিবার নিয়ে সুখে থাকলেও রওফা সবসময় শেকড়ের টান অনুভব করতেন মনের ভেতর। বড় হয়ে যখন জানলেন তার জন্মস্থান সুইজারল্যান্ড নয়, বাংলাদেশ; তখন স্বামীর সঙ্গে কথা বলে কুড়িগ্রামে হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে খুঁজতে আসেন তিনি। সপ্তাহ খানেক বিভিন্ন জায়গায় চষে বেড়িয়েছেন। তার কাছে থাকা তথ্য অনুসারে, উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নে নিজের পরিবারকে খুঁজে ফেরেন তিনি। কিন্তু পরে কাউকে না পেয়ে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে অনেকটা হতাশ হয়েই সুইজারল্যান্ডে ফিরে যান রওফা। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত এক বছর ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত জানুয়ারিতে রওফা যখন তার বাবা-মা’র খোঁজে বাংলাদেশে এসেছিলেন তখন তিনি ক্যান্সারের চতুর্থ পর্যায়ে ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে তাকে কয়েক দফায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। অবশেষে গত ৩ জুলাই তিনি ক্যান্সারের কাছে হার মেনে চলে যান না ফেরার দেশে।
শেষ অবধি নিজের বাবা-মা’র কোনও খোঁজ পাননি রওফা—এমন তথ্য জানিয়ে রাকিব আহসান আরও বলেন, ‘ক্যান্সারে আক্রান্ত রওফা নিজে একবারের জন্য হলেও নিজের আসল বাবা-মা’র পরিচয় জানতে এ দেশে এসেছিলেন। কিন্তু তার শেষ ইচ্ছাটুকু পূরণ হয়নি। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী ও ৫ বছরের একটি পুত্রসন্তান রেখে গেছেন।’
এদিকে রওফাকে নিজের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে হতে পারে বলে দাবি করেছিলেন উলিপুরের থেতরাই ইউনিয়নের ওকিতন নামের এক বৃদ্ধা। বিষয়টি রওফা অবগত ছিলেন কিনা এবং ওই বৃদ্ধার ছবি তিনি দেখেছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রাকিব আহসান জানান, রওফার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তার চিকিৎসকরা তাকে এ ধরনের কোনও খবর দিতে নিষেধ করেছিলেন। এতে তিনি মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়তেন বলে চিকিৎসকরা আশঙ্কা করেছিলেন। সে কারণে ওই তথ্য রওফাকে জানানো হয়নি। ওকিতন বেওয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাৎও ঘটেনি।