গাইবান্ধার চার উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এছাড়াও অন্যান্য সব জলাশয়ে পানি বাড়তে থাকায় নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা। শতশত বিঘা জমির আমন ধানের বীজতলা, পাট, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও ডুবে গেছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, ব্রিজ-কালভার্ট। অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
পানি ঢুকে পড়ায় ভেসে গেছে শত শত পুকুর ও খামারের মাছ। এদিকে, বন্যার কারণে জেলার চার উপজেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকসহ আড়াই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরমধ্যে সরকারিভাবে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বানভাসীদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে খোলা হয়েছে।
সরকারি হিসেবে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের ১৫২টি চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হিসেবে, চার উপজেলায় পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ব্রক্ষপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এরমধ্যে ব্রক্ষপুত্র নদে বিপদসীমার ১০৯ সেমি, তিস্তার পানি ১৬ সেমি ও ঘাঘটের পানি ৬৬ সেমি ওপর দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া করতোয়া নদীর পানিও বিপদসীমার মাত্র ১ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, পানিবন্দি হয়ে পড়া অধিকাংশ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, উচু জায়গা ও আশ্রয় কেন্দ্রে। গত তিনদিন ধরে দুর্গত এলাকার মানুষরা চরম দুর্ভোগে জীবন-যাপন করছেন। নিম্নআয়ের মানুষরা খাবার সংগ্রহ করতে না পেরে থাকছেন অর্ধাহারে-অনাহারে। গো-খাদ্যর সংকটসহ হাঁস-মুরগি নিয়েও বিপাকে পড়েছেন তারা।
বেলকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা আমেনা বেওয়া বলেন, ‘চারদিন ধরে বাড়িতে বানের পানি উঠছে। পানির কারণে রান্নাসহ চলাফেরায় বেশ সমস্যা হয়েছে। বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছি স্কুলে। ঘরে শুকনা খাবার যা ছিল, তা দিয়ে কোনও রকম দিন পার করছি। এ অবস্থা থাকলে খাবার সংকটে না খেয়ে থাকতে হবে’।
কাশেম বাজার এলাকার বাঁধে আশ্রয় নেয়া আবদুর রহমান বলেন, ‘পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। ঘরে বিছনা, আসবাবপত্র সব ডুবে গেছে। জীবন বাঁচাতে স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নেই। বাঁধে কয়েকটি টিনের চালা তুলে কোনও রকমে থাকতে হচ্ছে।’
বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ জানান, তার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছেন। পানিতে অনেকের ঘর-বাড়ি নষ্ট হয়েছে। শতশত হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। বন্যা দুর্গত মানুষরা বাড়িঘর ছেড়ে কোনও রকমে উঁচু বাঁধ ও আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। দুর্গত মানুষের মধ্যে মাত্র শতাধিক মানুষকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন। কিন্তু বিতরণ করা ত্রাণ চাহিদার তুলনায় অনেক কম।’
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বলেন, ‘ইউনিয়নের চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের অনেকেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, উঁচু জায়গা আর আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু কর্মহীন ও নিম্নআয়ের মানুষরা সেখানে অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছেন। এসব মানুষের মধ্যে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গো-খাদ্যর সংকটে গবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন তারা।’
প্রতিটি উপজেলার দুর্গত মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আরও ত্রাণ সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানান গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন। তিনি বলেন, ‘রবিবার পর্যন্ত বন্যা দুর্গত এলাকার মানুষের জন্য ২৪০ মেট্রিক টন চাল ও ২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে শুকনা খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। পানিবন্দি মানুষের জন্য চার উপজেলায় ১২০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে উচু জায়গা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ ১৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।’
ব্রক্ষপুত্র ও ঘাঘট নদীর তিনটি স্থানে বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত
ফুলছড়িতে ব্রক্ষপুত্র নদ ও সদরের ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের তিনটি জায়গা ভেঙে গেছে। এতে আশপাশের নিম্নঞ্চলের অন্তত ১০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুলাই) রাত ২টার দিকে ফুলছড়ি উপজেলার ব্রক্ষপুত্র নদের কাতলামারী এলাকায় ২০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। এছাড়া সকাল ৯টার দিকে সদর উপজেলার ঘাঘট নদীর খোলাহাটি ও কুটিপাড়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে যায়। এরআগে, রবিবার দুপুরে সদরের গিদারি ইউনিয়নের বাগুড়িয়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৫০ মিটার অংশ ভেঙে গেছে।
এদিকে ফুলছড়ির সিংড়া, সুন্দরগঞ্জের বেলকা, সদরের ব্রিজ রোড এলাকা ও সাদুল্যাপুরের পুরাণ লক্ষীপুর এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের আরও কয়েকটি জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে কোনও মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বাঁধ ভেঙে গেলে আরও বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, ‘নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত এবং প্রধান দুটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে যাওয়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভেঙে যাওয়া বাঁধের অংশে জিও ব্যাগ বালুর বস্তা ফেলার কাজ চলছে। তবে পানির প্রবল গতির কারণে ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামতে সময় লাগছে। এছাড়া বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও বালু বস্তা ফেলা হচ্ছে।’