ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে নাকাল নীলফামারী পৌরবাসী

পৌরকর্মীদের আন্দোলনের কারণে এভাবেই ময়লার স্তূপ জমছে নীলফামারী পৌর শহরে

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যায়, ডাস্টবিনের ময়লা তুলছেন পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। পরিবেশ রক্ষায় হাতে বেলচা আর ময়লার ঝুড়ি নিয়ে নিয়মিত কাজ করতেন তারা।

পৌরসভার ময়লাবাহী পিকআপের চালক মো. রফিক মিয়া মোবাইল ফোনে বলেন, পৌরসভার ময়লাবাহী গাড়ি চালিয়ে সামান্য ক’টা টাকা পাই, সেটাও ছয় মাস থেকে পাইনি। তাই সরকারি কোষাগার থেকে শতভাগ বেতন ভাতা ও পেনশনের দাবিতে আমরা আন্দোলনে নেমেছি।

তিনি জানান, এ বিষয়ে ঢাকায় ডাকা অবস্থান কর্মসূচিতে আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) পর্যন্ত কর্মকর্তা কর্মচারীরা থাকবেন। এজন্য পৌর শহরের ময়লা ফেলা বন্ধ রয়েছে।

এদিকে, পৌরকর্মীরা আন্দোলনে থাকায় একটানা ১২ দিন ধরে সড়কের বাতিও জ্বালানো হচ্ছে না। ফলে অন্ধকারে পথ চলতে হচ্ছে পৌরবাসীকে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে জমেছে ময়লার স্তূপ, এর দুর্গন্ধে নাকাল আশপাশের বসতবাড়ির লোকজন। এদিকে, পৌরসভা কার্যালয় তালাবন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে সেবাগ্রহীতারাও।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) দুপুরে নীলফামারী পৌরসভা কার্যালয়ের প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লার ডাস্টবিনগুলোতে উপচেপড়া ময়লার স্তূপ। অনেকস্থানে এগুলো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এসব জায়গা নাক ঢেকে কোনোমতে পার হচ্ছে পথচারীরা। অনেক ডাস্টবিনে কুকুর মরে আছে। কাক সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার করছে। দেখার কেউ নেই।

পৌর শহরের নিউ বাবুপাড়া মহল্লার বাসিন্দা ও পানদোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম (৫৬) বলেন, ‘প্রায় ১২ দিন ধরে বাড়ির পাশের ডাস্টবিনটি পরিষ্কার করা হচ্ছে না। এতে দুর্গন্ধে ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। সন্ধ্যার পর সড়ক বাতি না জ্বলায় অন্ধকারে চলাচল করতে হচ্ছে।’

তালাবদ্ধ নীলফামারী পৌরসভা ভবন

একই মহল্লার আলেয়া বেগম (৫৬) বলেন, ‘এলাকার মানুষের সুবিধায় বাড়ির পাশে ডাস্টবিন দিয়েছে পৌরসভা। এখন পরিষ্কার না করায় ওই ডাস্টবিনগুলো উল্টো যন্ত্রণার সৃষ্টি করছে। ময়লা জমে সৃষ্ট দুর্গন্ধে ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।’ এমনকি প্রয়োজনে শহরে যেতে হলে অন্ধকারে পথ চলতে হয়।

তিনি বলেন, ‘১২ দিনেরও বেশি সময় হলো ড্রেন পরিষ্কার করা ময়লা আবর্জনা রাস্তার ধারে তুলে রাখা হয়েছে। ওই ময়লা সরিয়ে না নেওয়ায় সেখান থেকে গন্ধ বের হচ্ছে। গন্ধে এলাকার লোকজনসহ পথচারীরা অসুবিধায় পড়েছেন।’

বারাই পাড়া মহল্লার মিজানুর রহমান (৪৫) বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে শহরে রাতে রাস্তার বাতি জ্বলছে না। ময়লা আবর্জনা যত্রতত্র পড়ে আছে। এসব ময়লার দুর্গন্ধ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, শহরে রাস্তার বাতি না থাকায় পথচারীরা পড়েছে বিপাকে।  রাস্তার ধারে জমে থাকা ময়লার দুর্গন্ধে স্কুলগামী শিশুরাও ভোগান্তিতে পড়ছে।’

এদিকে জরুরি প্রয়োজনে শিশুর জন্ম নিবন্ধনের কাগজ তুলতে আসা রুবিনা বেগম (৩০) বলেন, পৌর কার্যালয়টি বন্ধ দেখে ফিরে আসতে বাদ্য হয়েছি। এতে যাতায়তে আমার শুধু শুধু ৪০ টাকা রিক্সাভাড়া দিতে হলো।

নীলফামারী সদর আধুনিক হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. আবু শফি মাহমুদ বলেন, শহরের যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার গন্ধ্যে পরিবেশ দূষিত হয়। পাশাপাশি মশা,মাছির উপদ্রব বেড়ে যায়। বিষেশ করে মানুষ এখন ডেঙ্গু আতঙ্কে ভুগছে। শহর পরিস্কার পরিচ্ছন্নসহ বাড়ীর আশপাশ আবর্জনা মুক্ত রাখতে হবে। এতে শিশুরা কলেরা, টাইফয়েটসহ পানি বাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

নীলফামারী পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. দুদু মিয়া বলেন, সামান্য বেতনে চাকুরি করি। সেটাও পৌরসভা নিয়মিত পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া, বছরের দুটি ঈদ আসে, আমাদের ছেলে মেয়ে পরিবার পরিজন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। তাই সরকারী কোষাগার থেকে শতভাগ বেতন ভাতা ও পেনশন ভাতা আদায়ের দাবিতে পৌরসভার সকল সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস এসোসিয়েশনের নীলফামারী পৌর ইউনিটের সদস্য সচিব মো. ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শতভাগ বেতন ভাতা ও পেনশন ভাতা প্রদানের দাবি আমাদের দীর্ঘ দিনের। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না। দাবি আদায়ে আমরা সকল পৌরসভা কার্যালয়ে তালা দিয়ে গত ১৪ জুলাই থেকে ঢাকায় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূটি অব্যাহত থাকবে।

পৌরসভার প্যানেল মেয়র মো. ঈষা আলী বলেন, পৌরসভার সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে ড্রেন পরিস্কার, রাস্তা সংস্কার, রাস্তার ল্যাম্ম পোষ্টের বাতি বদলানো দীর্ঘদিন ধরে আছে। গোটা পৌর শহর ভূতরে পরিবেশ তৈরী হয়েছে। দশ বছরের উন্নয়ন এই বারো দিনে পন্ড হয়েছে।

এ ব্যাপারে, নীলফামারী পৌরসভার মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ বলেন,‘পৌরসভার কর্মকর্তা কর্মচারীরা বেতন ভাতার দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনে যাওয়ায় পৌরসভার সকল প্রকার সেবা বন্ধ রয়েছে। তার পরেও পৌর কর্মকর্তা কর্মচারীদের বাধার মধ্যেও আমি পৌরবাসীর ভোগান্তি কমাতে বিশেষ ব্যবস্থায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছি।’

জন্ম নিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ প্রদান বিশেষ ব্যবস্থায় চালু রাখা যাবে কি না জানতে চাইলে মেয়র বলেন, ‘ওই কাজটি যারা করেন, তারা না চাইলে সেটি চালু রাখা সম্ভব না।’

অপরদিকে, খবর নিয়ে জানা গেছে, নীলফামারী জেলার ডোমার, জলঢাকা ও সৈয়দপুর পৌরসভায় একই অবস্থা বিরাজ করছে।