স্বাস্থসেবায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিকছিটমহল বিলুপ্তির চার বছর পূর্ণ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট)। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়েছিল। মাত্র চার বছরে এসব এলাকার অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। ফলে বদলে গেছে তাদের জীবন ব্যবস্থা। সরকারি উদ্যোগে গোরস্তান থেকে শুরু করে বসতবাড়ি পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, নতুন নতুন স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তায় চলাচল করছে রিকশা-ভ্যান, অটো, থ্রি-হুইলারসহ নানারকম যানবাহন। বেকার তরুণ-তরুণীরা শিখছে কম্পিউটার। অনেকে আউটসোর্সিংয়ে যুক্ত হয়ে রোজগারও করছে। দল বেঁধে শিশুরা ছুটছে স্কুলে। এমনই চিত্র এখন পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পিছিয়ে পড়া ছিটমহলবাসীদের উন্নয়নে সরকার হাতে নেয় ব্যাপক পরিকল্পনা। ছিটমহলগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। সেজন্য জেলার সদ্য বিলুপ্ত ৩৬টি ছিটমহলের অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। প্রতিটি বাড়িতে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ, শিক্ষা বিস্তারে ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নির্মাণ, আশ্রয়ণ প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ভাতা প্রদান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাঁচা-পাকা রাস্তা, সেতু-কালভার্ট, মসজিদ-মন্দির, হাটসেড নির্মাণসহ সরকারের সব বিভাগের নাগরিক সেবায় বদলে গেছে এলাকার চিত্র। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। তিনটি কলেজসহ ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক, ভূমিহীন ৮১টি পরিবারের জন্য তিনটি গুচ্ছগ্রাম, মন্দির ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তরুণরাইতোমধ্যে জমির মালিকানা হস্তান্তর করা হয়েছে। নাগরিকদের দেওয়া হয়েছে স্মার্ট কার্ড। ভিজিএফ, ভিজিডিসহ বয়স্ক ও বিধবা নারীরা পাচ্ছেন মাসিক ভাতা। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১০২ কিলোমিটার রাস্তা। গড়ে তোলা হয়েছে ডিজিটাল পোস্ট অফিস। বিটিসিএল অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ, বেকার ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। প্রতিটি পরিবারের ছেলেমেয়ে স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ ছাড়াও দেশের বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছে। অনেকেই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছেন। এখন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন সাবেক ছিটমহলের অধিবাসীরা। ফলে পাল্টে গেছে বিলুপ্ত ছিটমহলের দৃশ্যপট। তারা এখন চলে এসেছে বাংলাদেশিদের মূল স্রোতধারায়। সরকারের নানামুখী উন্নয়নের ছোঁয়ায় এবং আকাঙ্ক্ষার চেয়ে অনেক বেশি পেয়ে খুশি ছিটমহলবাসী। তাই নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ দিনটিকে উদযাপন করবেন নতুন বাংলাদেশিরা।
বিলুপ্ত গাড়াতি ছিটমহলের বাসিন্দা নসিমন বেওয়া (৭০) তাদের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এখন অনেক ভালো আছি। আগে আমাদের একবেলা খাবার জুটতো না। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই। আমি বয়স্ক ও বিধবাভাতা পাচ্ছি।’ দেবীগঞ্জ উপজেলার শালবাড়ি ছিটমহলের শাহিনুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিদ্যুৎ পেয়েছি, কাঁচা-পাকা সড়ক নির্মাণ হয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, স্কুল-কলেজ নির্মিত হয়েছে। সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি।’
ঘৃহহীনদের আবাসন ব্যবস্থাবিলুপ্ত গারাতি ছিটমহল আন্দোলনের সাবেক নেতা মফিজার রহমান বলেন, ‘পাখিদের হিসাব হতো কিন্তু ছিটমহলের মানুষের হিসাব করা হতো না। দীর্ঘ বঞ্চনা শেষে আমরা আলোর মুখ দেখেছি। বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষদের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এখন আমাদের দাবি, এনটিআরসির শিক্ষক নিবন্ধনসহ সব শর্ত শিথিল করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করা হোক। ছিটমহল বিনিময়কারী আন্দোলনের নেতাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সম্মান দেওয়া উচিত। এসব এলাকায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য প্রধানমন্ত্র্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গত চার বছরে ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে আধুনিক ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তারা উন্নত জীবনযাপন করছেন। সরকারের সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে। আগামীতে আরও উন্নয়ন হবে।
ডিজিটাল পোস্ট অফিসপঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধান জানান, নতুন বাংলাদেশিরা যাতে মূল স্রোতধারা থেকে পিছিয়ে না থাকে সেজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করে চলছে সরকার।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আলোকে হাসিনা-মনমোহন প্রটোকল স্বাক্ষরের পর ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বিলুপ্ত হয় বাংলাদেশ-ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহল। অবসান হয় ছিটমহলবাসীদের ৬৮ বছরের বন্দিজীবনের। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ১১১টি ছিটমহলের ৪১ হাজার ৪৪৯ জন মানুষ বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়। ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি ছিটমহলের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় ৪৭টি এবং জলপাইগুড়ি জেলায় চারটি বিলুপ্ত ছিটমহলের ১৪ হাজার ২১১ জন মানুষ ভারতের নাগরিকত্ব পায়। ছিটমহল বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশ পায় ১৭ হাজার ২৫৮ একর এবং ভারত পায় সাত হাজার ১১০ একর জমি।