মোহাম্মদ ইসলাম ঝিনাইদহ সদর উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের আবদুল আজিজ মৃধার ছেলে। দুপুর আড়াইটার দিকে ইসলাম তার বাবা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে যশোর কারাগার থেকে ঝিনাইদহের উদ্দেশে রওনা হন।
কারামুক্ত হয়ে ইসলাম বলেন, ‘সন্তান পরিবারসহ আমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই।’
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. আবু তালেব বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশে কারাবিধি অনুযায়ী চার বছর পাঁচ মাস ১৮ দিন রেয়াতসহ মোট ১৯ বছর ১৭ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেন ইসলাম। তার সাজা হয়েছিল ৩০ বছরের। ২০০৫ সালের ১৩ জানুয়ারি আদালত তাকে দণ্ডাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠান। সন্তান ও স্ত্রীকে মেনে নেওয়ার শর্তসাপেক্ষে আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছেন। এর আগে চলতি বছরের ৩১ জুলাই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের ফের বিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ঝিনাইদহ কারাগারে ইসলামের জামিন আদেশ পৌঁছালে সেখান থেকে যশোর কারাগারে পাঠানো হয়। সে অনুযায়ী আজ (৯ আগস্ট) তাকে মুক্তি দেওয়া হলো। এই রায় বন্দিদের সংশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
২০০০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ইসলাম প্রেমের মাধ্যমে একই গ্রামের মালাকে বিয়ে করেন। কিন্তু বিয়ের পর বউকে বাড়িতে নিতে পারেননি। একপর্যায়ে মালা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে ইসলাম তাকে স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করেন। গর্ভের সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবি নিয়ে মালা ইসলামের বাড়ি গেলে তাকে বের করে দেওয়া হয়। ২০০১ সালের ২১ জানুয়ারি পুত্রসন্তান প্রসব করেন মালা। তার নাম রাখা হয় মিলন। মিলন ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মালার বাবা বাদী হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে ২০০১ সালে ধর্ষণের মামলা করেন ঝিনাইদহ নারী ও শিশু নির্যাতন স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে। আদালতের নির্দেশে পুলিশ ইসলামকে আটক করে। কিন্তু ইসলাম আদালতেও মালা ও তার সন্তানকে অস্বীকার করেন। এ সময় মালার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছেলে মিলনের ডিএনএ টেস্ট করা হলে তার পিতৃপরিচয় নিশ্চিত হয়।
আদালত ওই মামলায় ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০০৫ সালের ১৩ জানুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে ইসলাম আপিল করলে রায় বহাল রাখেন উচ্চ আদালত। উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করলে সেখানেও ইসলামের সাজার রায় বহাল থাকে। পরে আপিল রিভিউ আবেদন করেন ইসলাম। রিভিউ শুনানিতে আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চে মালা ও মিলনের স্বীকৃতির বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি তখন জানান, ইসলাম বর্তমানে মালাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চান। মিলনকে সন্তানের স্বীকৃতি দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে তিনি নিজ বাড়িতে নিতে চান। ইসলামের আইনজীবীর এই বক্তব্য শোনার পর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এক আদেশে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষকে কারাভ্যন্তরে ইসলাম ও মালার আবারও বিয়ে পড়ানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে জেলারকে আগামী ২৯ আগস্ট এ বিষয়ে অগ্রগতি জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ছেলেকে নিতে আসা ইসলামের বাবা আবদুল আজিজ বলেন, ‘ছেলেকে মুক্ত হওয়ায় আমি অনেক খুশি। ইসলামের ছেলেকে আমরা অনেক আগেই মেনে নিয়েছি।’
নাতি মিলন কেন আসেনি? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে তার মায়ের সঙ্গে ঢাকায় রয়েছে। তারা সেখান থেকে বাড়িতে আসবে।’
জেলার মো. আবু তালেব বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে জেলা প্রশাসকের অনুমতিক্রমে ৩১ জুলাই কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারপ্রাপ্ত সুপার, দু’পক্ষের আত্মীয়স্বজন এবং তাদের ছেলে মিলনের উপস্থিতিতে ইসলাম ও মালার বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের কাবিন উচ্চ আদালতে জমা দেওয়ার পর তার জামিন আবেদন মঞ্জুর হয়।’