‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নূর মোহাম্মদ স্মার্ট কার্ড নেন চট্টগ্রামে

নুর আলমের স্মার্ট কার্ড

টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত রোহিঙ্গা শীর্ষ সন্ত্রাসী নুর মোহাম্মদের (৩৪) কাছে বাংলাদেশি স্মার্ট কার্ড পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে এই স্মার্ট কার্ডটি সংগ্রহ করে সে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে তার রয়েছে চারটি বাড়ি। এসব বাড়িসহ প্রতিটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই স্ত্রী রয়েছে তার। জানা গেছে, এই স্ত্রীদের মাধ্যমেই সন্ত্রাসী কাজ পরিচালনাসহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতো সে। তার এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যেমন আছে আলোচনায়, তারচেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে রোহিঙ্গা হয়ে কী করে সে নিজের নাম বদলে স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করেছে। এ প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মনির হোসেন খান। অন্য রোহিঙ্গারাও এভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে কিনা তা যাচাই করতে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাস জানান, রবিবার (১ সেপ্টেম্বর) টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা শিবিরের পাহাড়ি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ গুরুতর আহত হয় নূর মোহাম্মদ। টেকনাফ হাসপাতালে আনা হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পুলিশের তিন সদস্য আহত হয়েছে। তারা হলেন, থানা পুলিশের ওসি (তদন্ত) এবিএমএস দোহা (৩৬), কনস্টেবল আশেদুল (২১), অন্তর চৌধুরী (২১)।

নিহত নূর মোহাম্মদ  যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক হত্যা মামলার আসামি ছিল।

ওসি বলেন, টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ি এলাকায় যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক হত্যা মামলার আসামি ও শীর্ষ সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা নুর মোহাম্মদ দলবলসহ অবস্থান নিয়েছে এমন খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। পরে সন্ত্রাসীরা পিছু হটলে সেখান থেকে নুরকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে টেকনাফ হাসপাতালে আনা হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শংকর চন্দ্র দেব নাথ বলেন, রবিবার সকালে পুলিশ হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ এক রোহিঙ্গাকে নিয়ে আসেন। তার বুকে ও পেটে ৬টি গুলির চিহ্ন রয়েছে। আহত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নূর মোহাম্মদ। (ছবি: ইউএনবি)

রোহিঙ্গা শিবির নূর মোহাম্মদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটকের পর তার কাছ থেকে একটি  বাংলাদেশি স্মার্ট কার্ড উদ্ধার করে পুলিশ। এই স্মার্ট কার্ডে সে নিজের নাম দিয়েছিল নূর আলম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার স্মার্ট কার্ডটির ছবি ছড়িয়ে পড়লে কার্ডটির সত্যতা জানতে কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করা হয়। সেখানে এর সত্যতা মিলে। তবে জানা যায়, নুর মোহাম্মদ তার পরিচয় পত্রটি কক্সবাজার জেলায় না করে  কৌশলে চট্টগ্রাম জেলার ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত করায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় অনেক নাগরিক ও রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, এই স্মার্ট কার্ড পাওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠে নূর মোহাম্মদ। ডাকাতি ও সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে ইয়াবা ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়ায় সে। এভাবে কাড়ি কাড়ি টাকা আয় করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তার চারটি বাড়ি রয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে স্ত্রীও রয়েছে তার।

টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহামুদ আলী জানান, ১৯৯১ সালে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা নূর মোহাম্মদ হ্নীলা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে জাদিমুরা এলাকায় প্রথমে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করে। এরপর থেকে রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ তৈরি করে বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি করে। সে ডাকাতির জন্য দুই বছর জেলও কেটেছে। এরপর সে ধীরে ধীরে সেখানেই জমি কিনে বাড়ির মালিক হয়। প্রতিটি ক্যাম্পে স্ত্রী থাকায় তার আধিপত্য বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে তারা। হ্নীলার এই চেয়ারম্যান আরও জানান, রোহিঙ্গা নূর মোহাম্মদের মালিকানায় বাংলাদেশে ৪টি বাড়ি রয়েছে। তার মধ্যে একটি পাকা ভবন, একটি দু’তলা, একটি টিনের ঘর এবং অপরটি বাগান বাড়ি। রয়েছে একাধিক স্ত্রী।

জানা গেছে, নিহত হওয়ার মাত্র দুদিন আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মেয়ের কান ফোড়ানোর অনুষ্ঠান করে সে। এসব অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গারা বিপুল পরিমাণ টাকা ও সোনার গহনা উপহার দিয়েছে তাকে। তবে রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, কথিত ‘উপহার’ হলেও এসব টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার তারা দিয়েছে নূর মোহাম্মদ ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে। এদিকে রোহিঙ্গা নূর মোহাম্মদ স্মার্ট কার্ডের বিষয়টি যাচাই করতে কক্সবাজার নির্বাচন অফিসের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তার স্মার্ট কার্ডটির সত্যতা পাওয়া যায়। কার্ডের নম্বরের সূত্র ধরে ওয়েবসাইটে যাচাই করা হলে বেরিয়ে আসে তার সব তথ্য। সেখানে দেখা যায়, নুর মোহাম্মদ ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ঠিকানায় বাংলাদেশি স্মার্টকার্ড তৈরি করে নিয়েছেন। কার্ডে নাম দিয়েছেন নুর আলম। পিতার নাম কালা মিয়া এবং মাতার নাম সরু বেগম। জন্ম তারিখ ২৫ নভেম্বর ১৯৮৩। এনআইডি নম্বর-৬০০৪৫৮৯৯৬৩। ফরম নম্বর: ৪০৩৬৫৬০৫, শিক্ষাগত যোগ্যতা: ২য় শ্রেণি, ভোটার সিরিয়াল নং: ২১৮৯, ভোটার এলাকা (এরিয়া কোড): বার্মা কলোনি (১৭২২)। তার স্থায়ী ঠিকানা হচ্ছে পশ্চিম ষোলশহর পার্ট-২, হিলভিউ রোড, ৪২১১ পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম বলে উল্লেখ করা হয়।

জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার শিমুল শর্মা বলেন, ‘অনেক রোহিঙ্গা নানাভাবে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে চায়। কিন্তু কক্সবাজার নির্বাচন অফিস ভোটার হতে অনেক বেশি তথ্য যাচাই-বাছাই করে। তাই এখানে সুবিধা করতে পারে না রোহিঙ্গারা। এ কারণে চট্টগ্রামে গিয়ে কোনও না কোনোভাবে এই রোহিঙ্গা বাংলাদেশি ভোটার হয়েছে।’

তবে রোহিঙ্গা নূর মোহাম্মদ চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকেই ভোটার হয়েছেন কিনা সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নন  কার্যালয়ের সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মনির হোসেন খান। এই এনআইডি ভুয়া না সঠিক সে বিষয়ে আরও যাচাই করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার বিষয়টি নজরে রাখা হচ্ছে।

সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মনির হোসেন খান বলেন, রোহিঙ্গারা ভোটার হতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে চেষ্টা করছে। এনআইডি হয়েছে এরকম কিছু রোহিঙ্গাকে তালিকাভুক্ত করে আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। নুর মোহাম্মদ সেই তালিকায় থাকতে পারে। কিন্তু এনআইডিটা ভুয়াও হতে পারে। সেটিও তদন্তের বিষয় রয়েছে।