পুলিশ কর্তৃক খুলনার ব্যবসায়ী শাহজালালের চোখ তোলার মামলায় সুষ্ঠু বিচার পেতে শাহজালালের পিতা হাইকোর্টে রিট করেছেন। এরপর এ সংক্রান্ত আদেশ সম্পর্কে জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের রুল জারি করেছেন আদালত।
শাহজালালের বাবা মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি তার ছেলের চোখ উৎপাটনের ঘটনায় খুলনার প্রশাসনের কাছে ন্যায় বিচার পাননি। যে কারণে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।’
হাইকোর্টের রুল আদেশ মতে জানা গেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহজালালের দুই চোখ উৎপাটন সংক্রান্ত চলমান মামলায় খুলনার সেশন জজ আদালতের ক্রিমিনাল রিভিশন এবং মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের আদেশ সম্পর্কে জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের রুল জারি করেছেন। ২৮ আগস্ট রুলের কপি খুলনার জেলা প্রশাসক ও সিএমএম আদালত বরাবর প্রেরণ করা হয়। এরআগে মামলার বাদী শাহজালালের মা রেনু বেগমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৮ জুলাই এই রুল জারি করেন। বাদী পক্ষে আদালতে আবেদন দাখিল করেন অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল মজিদ মোল্লা।
রুলে সেশন জজ খুলনার ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরের ক্রিমিনাল রিভিশন নং-২০৭ এবং একই বছরের ৩০ এপ্রিল খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের আদেশ (কেস নং-৩০৯, খালিশপুর) সম্পর্কে জানতে চেয়ে চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ফৌজদারি রিভিশন সংক্রান্ত অধিক্ষেত্র শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার মো. জাকির হোসেন পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত খুলনার জেলা প্রশাসক বরাবর প্রেরিত ২৮ আগস্টের পত্রে উল্লেখ করা হয়, আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে দাখিলকৃত আবেদন সূত্রে নোটিশ দেওয়া যাচ্ছে যে, আদালতে সুবিধামতো যথাশিগগির পরবর্তী কোনও তারিখে উপরোক্ত আবেদনের শুনানি এবং নিষ্পত্তি হবে। আপনাকে জানানো যাচ্ছে যে, জারিকৃত রুল কেন মঞ্জুর করা হবে না সে বিষয়ে কোনও কারণ দর্শালে তা বিবেচনা করা হবে।
এর আগে, ২০০৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের আমলি আদালতে শাহজালালের মা রেনু বেগমের দাখিলকৃত এজাহারে বলা হয়, ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই তার ছেলে শাহজালাল মহানগরীর নয়াবাটি রেললাইন বস্তি কলোনির শ্বশুরবাড়ি থেকে রাত ৮টায় শিশুর দুধ কেনার জন্য বাসার পার্শ্ববর্তী দোকানে যান। এসময় খালিশপুর থানার তৎকালীন ওসি নাসিম খানের নির্দেশে তাকে থানায় ডেকে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা থানায় গেলে ওসি তাকে ছাড়ানোর জন্য দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। দাবি করা টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ কর্মকর্তারা শাহজালালকে পুলিশের গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যায়। পরদিন ১৯ জুলাই খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে তাকে দুটি চোখ উপড়ানো অবস্থায় দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। এ সময় শাহজালাল জানান, পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে গাড়িতে করে গোয়ালখালী হয়ে বিশ্ব রোডের (খুলনা বাইপাস সড়ক) নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তার হাত-পা চেপে ধরে এবং মুখের মধ্যে গামছা ঢুকিয়ে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে দ’চোখ উপড়ে ফেলে।
এ ঘটনায় শাহজালালের মা রেনু বেগম বাদী হয়ে ১১ পুলিশ ও আনসার কর্মকর্তাসহ ১৩ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলো- খালিশপুর থানার সাবেক ওসি মো. নাসিম খান, এএসআই রাসেল, এসআই তাপষ কুমার পাল, এসআই মো. মোরসেলিম মোল্লা, এসআই মো. মিজানুর রহমান, কনস্টেবল আল মামুন, আনসার সিপাই মো. আফসার আলী, ল্যান্স নায়েক আবুল হাসেম, আনসার নায়েক রেজাউল হক, এসআই মো. নূর ইসলাম, এসআই সৈয়দ সাহেব আলী এবং সহযোগী সুমা আক্তার ও মো. রাসেল।
আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই খুলনার পরিদর্শক মো. বাবলুর রহমান খান আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, মামলার কোনও আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সপক্ষে কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বাদী পক্ষে আদালতে নারাজি পিটিশন দাখিল করা হয়। গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি খুলনা মহানগর হাকিম মো. শাহীদুল ইসলাম খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনারকে মামলাটির পুণরায় তদন্তের নির্দেশ দেন।