মজিবুর মৃধা উপজেলার নেয়ামতি ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের মৃত দলিল উদ্দিন মৃধার ছেলে এবং বরিশাল জেলা যুবলীগের সদস্য।
মজিবুরের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল চালক মো. সুজন বলেন, ‘গত সোমবার দুপুরে মাছ কিনতে ট্রলারে করে নেয়ামতি নদীর মোহনায় যান মজিবুর ভাই। এ সময় রাজাপুরের টহল পুলিশ ধাওয়া করে ট্রলারের কাছে এসে লাঠি দিয়ে বেশ মারধর করে তাকে। এর একপর্যায়ে মজিবুর ভাই নদীতে ঝাঁপ দেন। তার শরীরে ভারী পোশাক থাকায় নিজেকে সামলে উঠতে পারেননি। তিনি বারবার বলেন, আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান। এভাবে বলতে বলতে স্রোতে ভেসে অদৃশ্য হয়ে যান। মঙ্গলবার তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আমিসহ (সুজন) ট্রলারে থাকা আরও চার জন নদীতে ঝাঁপ দিলেও সাঁতরে তীরে উঠতে পারি।’
সুজন জানান, তারা ট্রলারে করে বাকেরগঞ্জ, ঝালকাঠির নলছিটি ও রাজাপুর উপজেলার বিষখালী নদীর মোহনায় গিয়েছিলেন। কিন্তু বাকেরগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম, নলছিটি থানার ওসি সাখাওয়াত হোসেন ও রাজাপুর থানার ওসি জাহিদ হোসেন অভিযান চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন।
বাকেরগঞ্জ উপজেলার মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘অভিযানটি আমাদের উপজেলা থেকে করা হয়নি। তবে কারা করেছে সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’
খোঁজ নিয়ে একাধিক সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজাপুর উপজেলা মৎস্য অফিসের ক্ষেত্র সহকারী আরিফ ও আব্দুল বারেক এবং রাজাপুর থানার এএসআই শহীদ কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিয়ে দুটি টিমে ট্রলারে করে বিষখালি নদীতে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযানে নামেন। স্থানীয় ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পালট ও নিয়ামতি এলাকার মাঝ নদীতে ইলিশ শিকারে নামা যুবলীগকর্মী মজিবুর রহমান মৃধাসহ কয়েকজনকে ট্রলারসহ আটকের চেষ্টা চালান রাজাপুর উপজেলা মৎস্য অফিসের ক্ষেত্র সহকারী আব্দুল বারেকসহ পুলিশের একটি টিম। এ সময় পুলিশ দেখে কয়েক ব্যক্তি নদীতে ঝাঁপ দেন। মজিবুর রহমান মৃধা ও তাদের ট্রলার চালককে ধরে অভিযানের ট্রলারে উঠানোর সময় ট্রলার চালকও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু মজিবুর রহমান মৃধাকে আটক করতে চাইলে তাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, ধস্তাধস্তি ও মারধর হয়। একপর্যায়ে নদীতে পড়ে মজিবুর রহমান মৃধা নিখোঁজ হয়। কিন্তু তার সঙ্গীদের ধারণা ছিল অভিযানের সময় পুলিশ মজিবুরকে ধরে নিয়ে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, অভিযানের সময় উৎসুক জনতা ও স্থানীয়রা নদীর দুই তীরে জড়ো হলে নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে অভিযান চালানো ট্রলার। এ সময় ওই এলাকার নদীতে একাধিক মাছ ধরার নৌকা থাকলেও অভিযানকারীরা কোনও জেলে বা নৌকা-জাল আটক না করে উত্তর দিকে চলে যায়। পরে মজিবুরের খোঁজে নামেন স্বজনরা। রাতভর খোঁজাখুঁজি করে জেলার বিভিন্ন থানা ও মৎস্য অফিসেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে সকালে নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযানে অংশ নেওয়া রাজাপুর থানার এএসআই শহীদ জানান, সোমবার দুপুরে মৎস্য ও পুলিশ যৌথভাবে দুটি টিমে ভাগ হয়ে কাজ করে। বাদুরতলা থেকে নাপিতেরহাট এলাকায় পুলিশের একটি টিম অভিযান চালায়। এবং মৎস্য অফিসের আব্দুল বারেকের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশের একটি টিম পালট থেকে অভিযান চালায়। মারপিট বা নদীতে কারও নিখোঁজ হওয়ার খবর তাদের জানা নেই।
অভিযোগ অস্বীকার করে রাজাপুর উপজেলা মৎস্য অফিসের ক্ষেত্র সহকারী আব্দুল বারেক জানান, যেখানে এ ঘটনা ঘটেছে, সেখানে তারা অভিযানে যাননি।
এদিকে ঘটনাস্থল ও লাশ উদ্ধারের স্থান রাজাপুর থানার আওতায় হলেও স্বজনরা সকালে বিষখালি নদী থেকে লাশ উদ্ধার করে বাকেরগঞ্জের নিয়ামতি তার নিজ এলাকার বাড়িতে নিয়ে যায়। এ কারেণে রাজাপুর থানা পুলিশ সেখানে না গিয়ে বাকেরগঞ্জ থানাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
তবে বাকেরগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম জানান, মাছ ধরতে বা কিনতে গেলে অভিযানের বোট দেখে নদীতে ঝাঁপ দেন মজিবুর। তবে কাদের অভিযান ছিল তা জানা যায়নি।
ওসি বলেন, ঘটনাস্থল ও লাশ উদ্ধারের স্থান রাজাপুরের মধ্যে। তাই ময়নাতদন্তের জন্য লাশ উদ্ধার ও মামলা তাদেরই (রাজাপুর থানা পুলিশ) করতে হতো। কিন্তু তারা করবে না।
রাজাপুর থানার ওসি জাহিদ হোসেন জানান, যেহেতু লাশ নিয়ে গেছে বাকেরগঞ্জ থানা এলাকার নিয়ামতিতে, তাই ওই থানার পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। তিনি আরও জানান, নদীতে নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ডও অভিযান চালায়। তবে রাজাপুর থানা পুলিশের সঙ্গে এরকম কোনও ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ কাউকে ধাওয়াও দেয়নি বা এরকম কোনও ঘটনাও দেখেনি।