স্থানীয় পরিবেশবাদীরা বলছেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করা, জেলা প্রশাসনের লোক দেখানো তালিকা তৈরি এবং আইনি জটিলতাসহ নানা মারপ্যাঁচের সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিগ্রাসী চক্র এসব জমি গিলে খাচ্ছে।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সভাপতি দীপক শর্মা দিপু বলেন, ‘বাঁকখালী নদীর জমি দখল নিয়ে জেলা প্রশাসন আইওয়াশ করছে। কারণ, বাঁকখালী নদীর জমি দখলকারী রাঘব-বোয়ালরা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ। তাই তাদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন টুঁ-শব্দও করে না। আমরা মনে করি, প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে আন্তরিক হবেন। এতে দ্রুত জমি উদ্ধার করা সম্ভব হবে।’
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, ‘২০১৪ সালে বাঁকখালী নদীর দখলদারদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বাঁকখালী নদীর সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলে যাওয়া জমি উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু, জেলা প্রশাসন দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক মাস আগে জেলা প্রশাসন একটি তালিকা তৈরি করেছে। কিন্তু, ওই তালিকায় প্রভাবশালীদের নাম নেই। তাই তালিকাটি বাদ দিয়ে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ আরেকটি তালিকা তৈরি করে প্রকৃত ভূমিগ্রাসীদের উচ্ছেদ করা হোক।’
এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আবছার বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের ইচ্ছে থাকলেও অবৈধ দখলে থাকা বাঁকখালী নদীর জমি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। ইতোমধ্যে বিএস জরিপের আওতায় জেলা প্রশাসন অবৈধ দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। কিন্তু, মহামান্য হাইকোর্ট ওই তালিকার বদলে সিএস জরিপের আওতায় নতুন একটি তালিকা তৈরি করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এতে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে জমি উদ্ধারে বিলম্ব হচ্ছে। এরপরও বিষয়টি নিয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাছে একটি প্রস্তাবনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীতে অবশ্যই অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে।’
বাঁকখালী নদীর দৈর্ঘ্য ৯০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে অবৈধ দখলদারদের বিভিন্ন স্থাপনা। জেলার প্রধান নদী হওয়ায় এ নদীর ওপর প্রায় সাত লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। কিন্তু, রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযানে গড়িমসি করছে।
বাঁকখালী নদী ও নদীর দুই তীর দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বসতবাড়ি, পাকা ও সেমিপাকা দোকানপাট, ময়দার কল, চিংড়ি ঘের, হোটেল, শৌচাগার, মুরগির খামার, লবণের গুদাম ও বরফকলের মতো স্থাপনা। এ নদী দখল করে অনেকেই আবাসন প্লট তৈরি করে বিক্রিও করছে। এ নদীর আশপাশ এলাকায় পাহাড় কাটার কারণে বর্ষাকালে কাটা পাহাড়ের মাটি পানির স্রোতে বিভিন্ন নালা, খাল-বিল হয়ে নদীতে এসে পড়ছে। ফলে ভরাট হচ্ছে নদী। কোথাও কোথাও রাবার ড্যাম দিয়ে এর গতিপথ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। ফলে বেড়ে গেছে লবণাক্ততা।
দখলের পাশাপাশি চলছে বিভিন্ন বর্জ্য ফেলে নদীদূষণের প্রতিযোগিতা। দূষণের এ প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছে কক্সবাজার পৌরসভাও। বাঁকখালী নদীর তিনটি স্থানে (পেশকারপাড়া, কস্তুরাঘাট ও বিআইডব্লিউটিএ কার্যালয় সংলগ্ন) প্রতিনিয়ত পড়ছে পৌরসভার বর্জ্য। শহরের হোটেল-মোটেলের বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে এ নদীতে।
বাঁকখালী নদীরক্ষায় ২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা)একটি রিট মামলা দায়ের করে। মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে বাঁকখালী নদী দখলকারীর তালিকা তৈরি করে তাদের উচ্ছেদ এবং দূষণের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত নদীতীর চিংড়ি বা তামাক কিংবা অন্য কোনও উদ্দেশ্যে ইজারা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে একটি রুলও জারি করেন। এ রুলে নদীটিকে কেন প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হবে না বা কেন প্রাথমিক প্রবাহ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে তা রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং নদীর উভয় তীরের উপকূলীয় বন ফিরিয়ে আনার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছেন আদালত।