আরিচা ও মাওয়া ফেরিঘাটে শীতের মৌসুমে ঘন কুয়াশার দৌরাত্ম্য চলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকে ফেরি চলাচল। এতে অসংখ্য যাত্রী ভোগেন তো বটেই, বিপুল আয় থেকে সরকারও হয় বঞ্চিত।এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর আওতায় ফেরির জন্য কুয়াশায় চলাচলের উপযোগী ফগলাইট কেনার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)।কিন্তু, এসব ফগলাইট কতটুকু সুফল এনে দিয়েছে তা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সচেতনমহলে ।
জানা গেছে, প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান বিআইডব্লিউটিসির মহাব্যবস্থাপক (মেরিন) ক্যাপ্টেন শওকত সরদার। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ১০টি ফগলাইট সরবরাহ করে মেসার্স জনি কর্পোরেশন। চলতি বছরের ৫ জুন লাইটগুলো মাওয়া ও পাটুরিয়া ঘাটের ছয়টি ফেরিতে সংযুক্ত হয়েছে। কিন্তু, কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলেছে এমন তথ্য দেননি ফেরি সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষই।
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালক, ফেরিচালক, প্রকৌশলী ও যাত্রীরা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত ফগলাইটের কোনও সুফল মেলেনি। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক শওকত সরদার আক্ষেপ করে বলেন, ইংল্যান্ডের জাহাজগুলোতে যে ফগলাইট ব্যবহার করা হয়, তা দিয়ে বাংলাদেশে একই ফল আশা করা যায় না। জাপানের জন্য হলেও এই প্রযুক্তি ঠিক ছিল। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জলপথ অনেকটাই ভিন্ন প্রকৃতির।
প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, শীতকালে এখানে নদী পথের ‘চ্যানেলে’ পর্যাপ্ত পানি থাকে না। তাছাড়া যেখানে সেখানে জেগে থাকে চর। কোথায় কোথায় পানির পরিমাণ কম সেটি বাঁশ দিয়ে চিহ্নিত করা থাকে। কোনও কোনও স্থানে চ্যানেল বেশ সরু। এসব ক্ষেত্রে ফগলাইটগুলো কোনও সুফল দিতে পারছে না।
কথা হয় বিআইডব্লিউটিসির আরিচা ফেরি বিভাগের ব্যবস্থাপক (মেরিন) আব্দুস সোবহানের সঙ্গে। সরেজমিনে গিয়ে দেখার অভিজ্ঞতা বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তিনি ব্যক্ত করেন। ফগলাইটের গায়ে লেখা আছে সাত হাজার ওয়াট শক্তির কথা। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। এর আলোতে স্বল্প দূরত্বেও ভালো দেখা যায় না। বরং সাদা চোখে যা দেখা যায় তার চেয়েও ঝাপসা হয়ে ওঠে চারপাশ।
ফগলাইট জ্বালিয়ে ফেরি চালানোর অভিজ্ঞতা কেমন তা জানতে চাওয়া হয় ফেরির মাস্টারদের প্রধান শামসুল আলম ভূঁইয়ার কাছে। তিনি বলেন, নতুন ফগলাইট লাগানোর পর ফেরি চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ লাইট জ্বালানোর পর চারপাশ যেন আরও কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আলোয় চোখ ঝলসে যায়। দৃষ্টি স্বাভাবিক হতে বেশ সময় নেয়।
আরিচা ফেরি বিভাগের এরিয়া ম্যানেজার ও ডিজিএম শেখ মোহাম্মদ নাসিম এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
লাইটগুলো যখন এতোটাই অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে, স্বয়ং প্রকল্প পরিচালকও তা স্বীকার করেছেন, তখন সচেতন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, কেন আগেই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হলো না। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিসির সভাপতি মো. মিজানুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ফগলাইট প্রকল্পটির ‘ট্রায়াল পিরিয়ড’ এখনও চলছে। কেন তা ঘন কুয়াশা মোকাবেলা করতে পারছে না তা খতিয়ে দেখতে একটি কারিগরি দল কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে কী আসে দেখা যাক।
বিআইডব্লিউটিসির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, প্রথমে সবার সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, পাটুরিয়া ও মাওয়া ফেরিঘাটে একটি করে মোট দুটি ফগলাইট ব্যবহার করে কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। ফল সন্তোষজনক হলে আরও ফগলাইট কেনা হবে। কিন্তু হঠাৎ পরিবর্তিত হয় সে সিদ্ধান্ত। তড়িঘড়ি করে বিআইডব্লিউটিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ৬,৬৫,০০,০০০ টাকা (ছয় কোটি পয়ষট্টি লাখ টাকা) ব্যয়ে একযোগে কেনা হয় ১০টি ফগলাইট।
সূত্রটি অভিযোগের আঙুল তোলে খোদ প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধেই। বলা হয়, শওকত সরদারের অতি উৎসাহ ও একটি বিশেষ মহলের হস্তক্ষেপের কারণে পাইলট প্রকল্পের পরিচালনা কমিটি পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
সূত্রটি আরও জানায়, বিআইডব্লিউটিসির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি ও প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন শওকত সরদারসহ মোট পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল ‘প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশনে’ (পিএসআই) আমেরিকা যান। সেখানে বসেই তারা পিএসআই সম্পন্ন করেন। সেইসঙ্গে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ভাইয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রকল্প পরিচালক শওকত বিশেষ ভূমিকাও রাখেন। এ সময় টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দ্রুততর হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফগলাইটের গায়ে ‘আমেরিকার তৈরি’ লেখা থাকলেও এর সার্কিট ব্রেকার কোরিয়ার। ফগলাইটের পেছনের তথ্য সম্বলিত স্টিকারটিতে ভরের ঘর ফাঁকা। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চুক্তিপত্রের সঙ্গে অনেকাংশেই প্রাপ্ত মালামালের মিল ছিল না। রিসিভিং কমিটি মাল বুঝে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন একটি মহল থেকে বদলি করাসহ বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে মাল নিতে বাধ্য করা হয়।
এই খাতে সাড়ে ছয় কোটিরও বেশি টাকা অপচয়ের অভিযোগ ওঠার কথা উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালককে প্রশ্ন করা হলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, এটি মন্ত্রণালয়ের বিষয়।
/এইচকে/টিএন/