সুনামগঞ্জের হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে কচ্ছপ গতি

সুনামগঞ্জের হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধসুনামগঞ্জে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে চলছে কচ্ছপ গতি। প্রতি বছর আগাম বন্যার হাত থেকে হাওরের বোরো ফসল রক্ষার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে হাওরে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। চলতি বছর ৭৪৭টি বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত ১৯টি বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে বিলম্ব ও বাঁধ নির্মাণের জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত সব কটি হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

এ কাজে সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণ করে পিআইসি গঠন এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে সুনামগঞ্জের ৪৫টি বড় হাওরে প্রায় ১৪শ’ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ রয়েছে। এসব বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো প্রতি বছর সংস্কার করা হয়। এ কাজ করতে হাওর পাড়ের কৃষক, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ করা হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, জেলার ছোট-বড় ৪৫টি হাওরে ৭০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ৭১১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির জন্য ১২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। কিন্তু কমিটি গঠন হয়েছে মাত্র ৩৫১টি। এখন পর্যন্ত দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর, ধর্মপাশা, তাহিরপুরসহ পাঁচটি উপজেলায় ১৯টি ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, ছাতক, সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। 

অন্যদিকে, দিরাই উপজেলায় ৯৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মধ্যে গঠিত হয়েছে ৪০টি, অবশিষ্ট রয়েছে ৫৪টি। ধর্মপাশায় ১৫৪টি কমিটির মধ্যে গঠিত হয়েছে ৪০টি, অবশিষ্ট রয়েছে ১১৭টি। তাহিরপুরে ৭০টির মধ্যে গঠিত হয়েছে পাঁচটি, অবশিষ্ট রয়েছে ৬৫টি। জগন্নাথপুরে ৪৫টির মধ্যে গঠিত হয়েছে ৩৭টি, অবশিষ্ট রয়েছে ৮টি। দোয়ারাবাজারে ৩৪টির মধ্যে গঠিত হয়েছে ২৮টি, অবশিষ্ট রয়েছে ৬টি। সদরে ২৭টির মধ্যে গঠিত হয়েছে ৩টি, অবশিষ্ট রয়েছে ২৪টি। এছাড়া বিশ্বম্ভরপুরে ২৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এবং জামালগঞ্জে কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়নি।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের কৃষক নিটুল বিশ্বাস বলেন, ‘এখনও বাঁধের কাজ শুরু হয়নি তাই জমির ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।’ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামের হান্নান মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণের কাজ দেরিতে শুরু হয়। এরকম করলে তো ক্ষেত-গেরস্থি কইরা কোনও লাভ নেই।’ 

সুনামগঞ্জ বাঁচাও হাওর আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ‘এ বছর অনেক দেরিতে নামছে হাওরের পানি। তাই কৃষকরা ধান রোপণ করতে পারছেন না। অন্যদিকে, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনে গাফিলতির কারণে অকাল বন্যা হলে লাখ লাখ কৃষকের ফসল নষ্ট হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড জামালগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল কবীর বলেন, ‘জামালগঞ্জ উপজেলায় এখনও কোনও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন বা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। শিগগিরই শুরু করা হবে।’

কাবিটা নীতিমালার আলোকে হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীর বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের কাজ শেষ করেছি। দ্রুত এগুলোর অনুমোদন দেওয়া হবে। তারপর বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এমনিতে হাওরের পানি দেরিতে নামায় বাঁধ নির্মাণ প্রক্রিয়া অনেকটা বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাবিবুর রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু হাওরে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুত বাকিগুলোতে নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। এ বিষয়ে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। চলতি বছর জেলায় ২ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।’