বাজিতপুরে একই পরিবারে ৬ প্রতিবন্ধীর করুণ আর্তনাদ

Kishoreganj%20Protibondhi%20Photo-7‘পোলাপানডি হাত পা বালা লইয়া জন্ম লয়। ৩/ ৪ বছর বালাই তাহে। এর পর তেইক্কাই হাত পা চিকন আর বেইক্কে যায়। নিজে তো সারা জীবনের জন্যই লুলা হইয়া গেছি। ভাবলাম পোলা পানডিনি একটু চিকিৎসা করাইলে বালা হয়। কত জনরে যে হাতে পাও ধরলাম এদের চিকিৎসার জন্য। কোনও কাজ অইলো না।’ কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের মরম আলীর কণ্ঠে শোনা গেল এমন আর্তনাদ। নিজের পরিবারে ৬ জন প্রতিবন্ধীকে নিয়ে এরকমই আহাজারি তার।

আজ ৩ ডিসেম্বর জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হচ্ছে। প্রতি বছরই এই দিনে সেমিনার, ওয়ার্কশপ আর র‌্যালির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে কারও কারও ভাগ্য ফিরলেও মরম আলীর মতো অনেকের ভাগ্য ফেরে না কখনও।

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর ইউনিয়নের বিলপাড়া গজারিয়া গ্রামের একই পরিবারের আট সদস্যের মধ্যে ছয়জন প্রতিবন্ধী হওয়ায় দুঃখে-কষ্টে  জীবন-যাপন করছেন মরম আলী ও তার পরিবার। তাদের করুণ আর্তনাদের কথা শোনার কেউ নেই।মরম আলী চান, তার ছেলে-মেয়েরা সবাই পড়ালেখা করে যাতে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চেষ্টায় অভাব তাদের হার মানাতে পারেনি এখন পর্যন্ত। বড় ছেলে সুজন মিয়া ও মেয়ে মার্জিয়া আক্তার এসএসসি পাস করে এখন কলেজে পড়ছে। ছোট তিন মেয়ে জহুরা, মুক্তা ও পান্না স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে পড়ালেখা করছে।               

জন্মের ছয় বছর পরই প্রতিবন্দিত্বের শিকার হন মরম আলী। তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ। ফলে কোনও কাজ করতে পারেন না তিনি। এ অবস্থায় তার বাবা পার্শ্ববর্তী মণ্ডলভোগ গ্রামের ফুল বানুর সঙ্গে ১৯৮৬ সালে বিয়ে দেন। এই দম্পতির ছয়টি সন্তানের মধ্যে পাঁচজনই প্রতিবন্ধী। জন্মের সময় সুস্থ্য থাকলেও তিন থেকে চার বছর হলেই পাগুলো চিকন হতে থাকে এবং পরে কোমর থেকে নিচের অংশ অবশ হয়ে হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলে তারা। ধীরে ধীরে হাতের স্বাভাবিক শক্তিও লোপ পায়। পরিবারের দুজন মানুষ পুরোপুরি সুস্থ আছেন সুজনের  মা ফুল বানু আর ছোট বোন সাফিয়া।

তবে তারা প্রতিবন্ধী জীবনকে মানিয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই করছে প্রতিনিয়ত। হুইলচেয়ারে করে তারা স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়া করে। সংসারে আয়ের ভালো কোনও  উৎস না থাকায় ছেলে-মেয়েদের পড়া-লেখা ও সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন মরম আলী। তিনি প্রতিবন্ধী পরিবারটিকে পুনর্বাসন করার জন্য সমাজের বিত্তবান মানুষ ও সরকারের কাছে জোড় দাবি জানিয়েছেন।

২০০৮ সালে সর্ব প্রথম মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন নামে একটি সামাজিক সংগঠনের চেয়ারপারসন মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া ঐ প্রতিবন্ধী পরিবারের জন্য এগিয়ে আসেন। পরে স্থানীয় ব্র্যাক শিক্ষা প্রকল্প থেকে দুটি এবং বাজিতপুর-নিকলীর সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন দুটি হুইল চেয়ার দেন। ওই হুইলচেয়ার দিয়েই তারা এখন চলাফেরা করছেন।

মা ফুলবানু কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছয় ছয়ডা মানুষ এক ঘরে হাত পা লুলা হইয়া আছে। একটাও নিজের কাম নিজে করতে পারে না। সহাল বেলা মুক ধোয়ানো থেইক্কা শুরু কইরা রাইত পর্যন্ত হেরার সব কাম আমার করতে হয়। নিজের জামা কাপড়ডাও নিজে পিনতারে না। এমনও দেহা যায় ওরার পায়হানা, গোসলও আমার কোলে লইয়া করাইতে হয়, বাবা আপনেই কইন একলা ক্যামনে আমি ফারি?’

কলেজ পড়ুয়া সুজন ও মার্জিয়া জানান, তারা সমাজের বোঝা না হয়ে শত দুঃখ, কষ্ট বেদনার মধ্যে দিয়েও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। একদিন সফলতা ধরা দেবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস তাদের।

 

বাজিতপুর উপজেলার সমাজকল্যাণ অফিসার  মোহাম্মদ শেতারুজ্জামান বলেন, ‘একই পরিবারের ছয়জন সদস্য প্রতিবন্ধী হওয়ায় এটি নিয়ে আমরা খুবই উদ্বীগ্ন ও চিন্তিত। কেন এ রকম হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ওই পরিবারের তিনজনকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে আমরা চিন্তা করছি কীভাবে এ পরিবারটিকে বাঁচানো যায়। আর্থিকভাবে অন্য কোনও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায় কিনা, তাতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

 

/এআর/এফএস/