৭৩ কেজির বাঘাইর, ৮ কেজির মিষ্টি

পোড়াদহ মেলায় ওঠা বাঘাইর মাছবগুড়ার গাবতলীতে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা। একদিনের এ মেলায় লাখো মানুষের ঢল নামে। বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই জমে উঠে মেলা। মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ৭৩ কেজি ওজনের বাঘাইর মাছ এবং ৮ কেজি ওজনের মাছ আকৃতির মিষ্টি। বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে শুধু নারীদের কেনাকাটার জন্য বসবে ‘বউমেলা’।

এলাকার প্রবীণরা জানান, গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ি বন্দর এলাকায় গাড়িদহ নদী তীরে সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে একদিনের ‘পোড়াদহ’ মেলা বসে। প্রায় ১৫৩ বছর ধরে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে স্থানীয়রা এ মেলার আয়োজন করে আসছেন। মেলার প্রধান আকর্ষণ বিশাল আকৃতির নদীর মাছ।পোড়াদহ মেলায় মাছ আকৃতির মিষ্টি

স্থানীয় প্রবীণরা আরও জানান, প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বা ফাল্গুনের প্রথম বুধবার ‘পোড়াদহ’ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জমিতে কোনও চাষাবাদ হয় না। মেলাকে ঘিরে উৎসবের আমেজে মেতে উঠেন আশপাশের গ্রামের নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ। মেলা একদিনের হলেও এর আমেজ দুই-তিন দিন থাকে। এই মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাই বা আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করা স্থানীয় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।পোড়াদহ মেলায় মাছ

মেলাকে সামনে রেখে নারীরা আগেই বাড়িঘর পরিষ্কার করে নেন। মুড়ি, খৈ ভাজা, নাড়কেলের নাড়ু ও হরেক রকম পিঠা তৈরি করেন। মেলার দিন মেলা থেকে বড় মাছ কিনে স্বজনদের আপ্যায়ন করা হয়। নদী ও সাগরের বড় বড় মাছ, মিষ্টি, ফার্নিচার, তৈজসপত্রসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি হয়। প্রশাসন কঠোর থাকায় এবার মেলায় কোনও জুয়া বা অশ্লীল নৃত্য হয়নি। তবে মেলায় ইচ্ছামতো টোল আদায় ও অব্যবস্থাপনা ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এবারের মেলায় ৭৩ কেজি ওজনের যমুনা নদীর বাঘাইর মাছ তোলা হয়েছিল। মাছের মালিক গাবতলী উপজেলার মহিষাবান গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী বিপ্লব। মাছের মালিক প্রথমে প্রতি কেজি এক হাজার ৮০০ টাকা দাবি করেন। ওই হিসাবে এ মাছের দাম চাওয়া হয় এক লাখ ৩১ হাজার ৪০০ টাকা। পরে চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতি কেজি এক হাজার ৬০০ হাজার টাকায় ধার্য হয়। ক্রেতারা কেজি দরে মাছটি কিনে নেন। বিপ্লব জানান, প্রতি বছর তিনি বড় মাছ আমদানির চেষ্টা করে থাকেন। এ মাছটি তিনি যমুনা নদীর মাঝিদের কাছ থেকে কিনেছেন।পোড়াদহ মেলায় মাছ

বগুড়া শহরের কারবালা এলাকার ব্যবসায়ী রুহুল আমিন জানান, পরিবারের সদস্যরা বড় মাছ খেতে পছন্দ করেন। তাই তিনি প্রতি বছর পোড়াদহ মেলায় আসেন। কিন্তু এত বড় মাছ এককভাবে কেনা সম্ভব নয়; তাই তিনি তিন কেজি কাটা মাছ কিনেছেন। গাবতলী উপজেলার মহিষাবান গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী জানান, তিনি দুই কেজি মাছ কিনেছেন।

একাধিক মাছ বিক্রেতা জানান, এ মেলায় গাঙচিল, চিতল, বোয়াল, রুই, কাতলা, মৃগেল, হাঙড়, গ্রাসকার্প, সিলভার কার্প, বিগহেড, কালবাউশ, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাঝারি ও বড় আকারের মাছ উঠেছে। এসব মাছ ওজনে ৫-২০ কেজি পর্যন্ত রয়েছে। মাছ বিক্রেতারা জানান, প্রতি কেজি গাঙচিতল ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চিতল ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, বোয়াল ৭৫০ থেকে ১৫০০ টাকা, রুই ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা, কাতলা ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা, মৃগেল ৩৫০ থেকে ৮০০ টাকা, হাঙড় ২৫০ থেকে ৬০০ টাকা, গ্রাসকার্প ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, সিলভার কার্প ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, বিগহেড ৪০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, কালবাউশ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, পাঙ্গাস ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে।পোড়াদহ মেলায় মাছ আকৃতির মিষ্টি

মেলায় হরেক রকম মিষ্টি বিক্রি হয়। প্রতি কেজি মিষ্টি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। আট কেজি ওজনের একটি মাছ আকৃতি মিষ্টি বিক্রি হয় পাঁচ হাজার টাকায়। এছাড়া মেলায় কাঠ ও স্টিলের আসবাবপত্র, কুল বড়ই, নানা ধরনের আচার, গরু, মহিষ ও খাসির মাংস, পেঁয়াজ, মরিচসহ সব ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী তোলা হয়েছিল। বিনোদনের জন্য মেলায় ছিল মোটরসাইকেল খেলা, সার্কাস, জাদু ও নাগরদোলা।

মেলার পরিচালক মহিষাবান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, “শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে শুধু নারীদের কেনাকাটার জন্য ‘বউমেলা’ অনুষ্ঠিত হবে।”পোড়াদহ মেলা

গাবতলী থানার ওসি সাবের রেজা আহমেদ জানান, ‘শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’ বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা জানান, ‘ঐতিহ্যবাহী এই পোড়দহ মেলার নিরাপত্তা রক্ষায় আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন পুলিশ সদস্যরা।’