সাত বছরে গণপিটুনিতে নিহত ৯৫৯

Gonopituniগত সাত বছরে গণপিটুনিতে মারা গেছে ৯৫৯ জন। এ বছর ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২৪ জনকে গণপিটুনির নামে হত্যা করা হয়েছে। অতীতের সব নৃশংসতা ছাড়িয়ে গেছে এ বছরের ঘটনাগুলো। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের দাবি আইনের শাসনের ঘাটতির কারণেই বার বার ঘটছে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড। আর এমন হত্যার অভিযোগ উঠলে বিচার পাওয়ার নজির নেই বললেই চলে। অপবাদ সহ্য করে বিচারের আশা ছাড়তে হচ্ছে স্বজনদের।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার ও আসকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ১২৭ জন। ২০১০ সালে ১৭৪ জন। ২০১১ সালে ১৬১, ২০১২ সালে ১৩২, ২০১৩ সালে ১২৫ ও ২০১৪ সালে ১১৬ জন।
গত ১০ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় ডাকাত সন্দেহে আটজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। মামলায় প্রায় ১২শ আসামি করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পরদিন দিনাজপুরের কোতয়ালী এলাকায় একটি পেট্রোল পাম্পে সশস্ত্র ডাকাতি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে ১ জন নিহত ও ২ ডাকাত আহত হয়েছেন। এ ছাড়াও ৫ জুলাই রাতে বোয়ালমারিতে পিটিয়ে রাকিবুল ইসলাম ওরফে মিরন ও ফরহাদ মোল্লা নামের দুইজনকে হত্যা করেছেন গ্রামবাসী। পরে জানা যায়, তারা ডাকাত নন। নিহত রাকিবুলের একটি রড-সিমেন্টের দোকান রয়েছে। ২৪ জুন রাতে ফরিদপুর সদর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নে ডাকাত সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে গ্রামবাসী। ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে ফরিদপুর সদর উপজেলার আলিয়াবাদ এলাকা গণপিটুনিতে মারা যান মাসুম মৃধা নামে এক অ্যাম্বুলেন্স চালক। ২৫ জানুয়ারি নরসিংদী সদরে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় সাতজনকে। ৮ এপ্রিল মেহেরপুরে তিনজনকে এবং সিলেটে ১৩ বছরের শিশু সামিউল আলম রাজনকে চোর আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

এ ধরনের ঘটনার শুরুতে পুলিশ ব্যবস্থা না নিলেও গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সমালোচিত হওয়ার পর কিছু কিছু ক্ষেত্রে আসামিদের গ্রেফতার করতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হলে তা খুন হিসেবে গণ্য হবে, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে এখন পর্যন্ত গণপিটুনি দিয়ে হত্যার বিচারের নজির নেই।

আড়াইহাজারে গণপিটুনির বিষয়ে বৃহস্পতিবার আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হলে জনগণের পক্ষে এমন সহিংস হওয়া সম্ভব হতো না। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এ ধরনের নৈরাজ্যকর ঘটনা আইনের শসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার স্বাক্ষর রাখে।’

অপরাধ দমনের জন্য আইন ও বিচার ব্যবস্থা থাকার পরও অসাংবিধানিক উপায়ে কাউকে ‘শাস্তি দেওয়া এবং অপরাধীর বিচার ও শাস্তি বিধানের দায়িত্ব’ নিজ হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আসক মনে করে। আড়াইহাজারের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও এ ধরনের গণপিটুনির ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূলত তিনটি কারণে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। প্রথমত আইনের শাসনের ঘাটতি, দ্বিতীয়ত আইনের সাহায্য পাওয়ার ঘাটতি এবং তৃতীয়ত বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা।’

মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিনা বিচারে কাউকে মারা অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার।’

/এআরআর/এএ/এফএ/ এএইচ/