পাঁচ হাসপাতাল ঘুরে মৃত্যু

সাভারশরীরে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে একে একে পাঁচটি হাসপাতালে ছুটে গেছেন চিকিৎসার জন্য। তবুও জসিম উদ্দিনের (৫২) ভাগ্যে জোটেনি চিকিৎসা। অবশেষে রাত ৩টার দিকে স্ট্রোক করে মারা গেছেন তিনি। রবিবার (১৩ এপ্রিল) দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত ঘোরার পর এভাবে করুণ মৃত্যু হয় সাভারের হেমায়েতপুরের জয়নাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জসিমের। এদিকে, করোনায় আক্রান্তের গুজবে রবিবার রাতেই তার বাড়ি লকডাউন করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সায়েমুল হুদা।

জসিম কেরানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজনগর গ্রামের মমতাজ উদ্দিনের ছেলে। তিনি সাভারের ওই এলাকায় বাড়ি করে দীর্ঘদিন বসবাস করছিলেন। হেমায়েতপুর এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন তিনি।

নিহতের শ্যালক রেজাউল করিম বলেন, ‘জসিম বংশগতভাবেই হাঁপানি ও অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। গত দুই বছরে তিনি দুইবার স্ট্রোক করেছেন। এ কারণে তার মুখ বাঁকা হয়ে যাওয়াসহ শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। গত রবিবার সকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে দুপুরের দিকে তাকে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে ভর্তি করা হয়। ভর্তির কিছু সময় পরই কর্তৃপক্ষ তাকে করোনা আক্রান্ত রোগী হিসেবে হাসপাতাল থেকে ছাড়ার নির্দেশ দেয়। তবে রোগীর স্বজনরা তিনি করোনায় আক্রান্ত নন, দাবি করে সেখানেই চিকিৎসা দেওয়ার জন্য অনুনয় করতে থাকেন। কিন্তুও কোনোভাবেই এই হাসপাতালে তাকে ভর্তি রাখা যাবে না বলে জানিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অবশেষে রাত ৯টার দিকে তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে তার স্বজনরা সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে থাকা চিকিৎসকরা করোনা সন্দেহে রাত ১১টায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করে। সেখানে পরীক্ষার পর করোনায় আক্রান্তের লক্ষণ না পাওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগ থেকে ভর্তি করা হলেও ইউনিট ম্যানেজার তাদের না রেখে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়। এরপর রাত সোয়া ২টার পরে বাবুবাজার এলাকার ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করানোর কিছু সময় পর রাত ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মহানগর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্ট্রোক করে মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন ডেথ সার্টিফিকেটে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আনোয়ারুল কাদের নাজিম হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘জসিম উদ্দিনের শরীরে করোনাভাইরাসের লক্ষণ ছিল কিনা, তা আমার জানা নেই। তবে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে  রেফারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। জোর করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ সত্যি নয়।’

তবে জসিমের স্বজনরা অভিযোগ করেন, একজন অসুস্থ রোগীকে এতো টানাহেঁচড়া করার কারণেই মৃত্যু হয়েছে। এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পরও শুধুমাত্র করোনার সন্দেহের কারণে বিনা চিকিৎসায় তাদের বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা এবং তাদের মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা বলেন, ‘মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি যে আচরণ চিকিৎসকরা করেছেন, তা কোনোভাবেই আমাদের কাম্য নয়। আমাদের মতো আর কোনও রোগী যেন তাদের অবহেলার কারণে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

এ বিষয়ে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়েমুল হুদা বলেন, ‘জসিম উদ্দিনকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার পর করোনার উপসর্গ পাওয়া গেলে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ওই রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন ছিল, যা আমাদের এখানে নেই।’ স্ট্রোক করে মারা যাওয়ায় জসিমের বাড়ি থেকে লকডাউন প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।