অভিবাসী শ্রমিক: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নেপথ্য কারিগর

Immigrant 02

 

জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র ছোটে মানুষ। স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের খোঁজে সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে একসময় পৌঁছায় অন্য কোনও দেশে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ পাঠিয়ে চাঙ্গা রাখে নিজ দেশের অর্থনীতি। কোনও কোনও দেশের শ্রমবাজারের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছেন অভিবাসী শ্রমিকরা। এই অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখার প্রয়াসে প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস।

বাধ্য হয়েই নিজ দেশের সীমানা ছাড়েন অভিবাসীরা। তবে এতে করে উপকৃত হয় দু’দেশই-দেশান্তরী ব্যক্তির নিজ দেশ; আর যে দেশে তিনি অভিবাসী হচ্ছেন সেটিও। একদিকে তার পাঠানো রেমিটেন্সে লাভবান হয় তার স্বদেশ। অন্যদিকে নিজের শ্রম, মেধা আর কাজ দিয়ে তিনি সমৃদ্ধ করেন ভিনদেশের অর্থনীতি। এভাবে তারা হয়ে ওঠেন দুই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নেপথ্য কারিগর।

বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স ওইসব দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে দেওয়া আন্তর্জাতিক সাহ্যয্য তহবিলের পরিমাণের চেয়েও বেশি।

এবারের অভিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘বিশ্বময় অভিবাসন, সমৃদ্ধ দেশ, উৎসবের জীবন’। দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিবাসীদের মানবাধিকারের বিষয়ে দেওয়া অঙ্গীকার পালন করতে হবে।

বান কি-মুন বলেন, ২০১৫ সাল মানবপাচার ও অভিবাসী ট্র্যাজেডির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গত ১২ মাসে অধিকতর ভালো জীবনের সন্ধানে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ হাজারের অধিক নারী, পুরুষ ও শিশু। মানব পাচারকারীদের শিকারে পরিণত হয়েছেন ১০ সহস্রাধিক মানুষ। আর বিদেশি বিদ্বেষী নীতি এবং বিদ্যমান ভয়-আতঙ্কে বলির পাঁঠায় পরিণত হয়েছে ১০ লক্ষাধিক মানুষ।

বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় টেকসই উন্নয়নে অভিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের জন্য বিশ্বনেতাদেরকে অভিবাসী কর্মীদের শ্রম অধিকার, মানবপাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে লড়াই করা এবং অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে। অভিবাসীদের অবস্থা যেমনই হোক তাদের মানবাধিকারের বিষয়ে সবার পুরো সম্মান থাকা প্রয়োজন। নিয়মিত অভিবাসনের জন্য আমাদেরকে নিরাপদ চ্যানেলগুলোকে আরও প্রসারিত করতে হবে। অভিবাসী ও শরণার্থীদের নিয়ে এই রোডম্যাপ আমি সাধারণ পরিষদেও উত্থাপন করেছি।

i-am-migrant

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, আসুন আন্তর্জাতিক অভিবাসন দিবসে আমরা সম্মিলিতভাবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিবাসীদের মানবাধিকারের বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ হই।

পৃথিবীর সবচেয়ে কম জন্মহারের দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে জার্মানি। দেশটির বিশ্লেষকরা বলছেন, জন্মহারের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংকটে পড়বে দেশটি। অবশ্য এরই মধ্যে যে এর আঁচ পড়তে শুরু করেছে সেটা বোঝা গেলো একটি জার্মান প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান টমাস এগেনটার-কথায়। তার ভাষায়, ২০ বছর আগে যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা আমাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতো, আর আজ আমরাই যোগ্য প্রার্থীদের খুঁজে বেড়াই।

জার্মানিতে প্রতি ১ হাজার অধিবাসীর মধ্যে গত পাঁচ বছরে মাত্র ৮ দশমিক ২টি শিশু জন্ম নিয়েছে। একই সময়ে জাপানে প্রতি ১ হাজার অধিবাসীর মধ্যে শিশু জন্ম নিয়েছে ৮ দশমিক ৪টি। গত পাঁচ বছরে, পর্তুগালে প্রতি ১ হাজার অধিবাসীর মধ্যে শিশু জন্ম নিয়েছে ৯টি এবং ইতালিতে জন্ম নিয়েছে ৯ দশমিক ৩টি। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যে প্রতি হাজারে শিশু জন্মের এই হার ১২ দশমিক ৭। এমন বাস্তবতায় নিজ দেশের কর্মক্ষম তারুণ্যের সংখ্যা কমে গেলে সঙ্গত কারণেই অভিবাসীদের ওপরই ভর করতে হবে যে কোনও দেশের। ফলে তাদের শুধু বিদেশি কর্মী হিসেবে না দেখে যথাযথ মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

আই অ্যাম এ মাইগ্র্যান্ট

দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজারো অভিবাসীর জীবনের গল্প সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে এক নতুন প্রচারণা। ‘আই অ্যাম এ মাইগ্র্যান্ট’ নামের এই প্রচারণার যৌথ উদ্যোক্তা অভিবাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইওএম) ও ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা জেসিডব্লিউআই। আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসকে সামনে রেখে গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে http://iamamigrant.org/ নামের ওয়েবসাইটটি।

এই ওয়েবসাইটে অভিবাসীদের জীবনের গল্পের পাশাপাশি থাকবে তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত। তারা কোন দেশের বংশোদ্ভূত এবং বর্তমানে কোথায় বাস করছেন—এক নজরে পাওয়া যাবে সে তথ্যও।

আইওএম ও জেসিডাব্লিউআই-এর এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের প্রত্যাশা এ ওয়েবসাইটটি দুনিয়াজুড়ে অভিবাসনবিরোধী পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাসহ অভিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের বিষয়টি সামনে তুলে ধরবে।

এ উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার ব্রিটেনের জয়েন্ট কাউন্সিল ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব ইমিগ্র্যান্টসের (জেসিডাব্লিউআই) সায়রা গ্রান্ট। তিনি বলেন, অভিবাসীদের নিয়ে নানা অলীক ও ভীতিপ্রদ গালগল্প ছড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

আইওএম-এর ব্রিটিশ মিশনের প্রধান দিপ্তী পারদেশি বলেন, তার আশা এই প্রচারণা অভিবাসী অন্তর্ভুক্তি নীতি বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে সহায়ক হবে।

ব্রিটেনের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনও এই প্রচারণার অন্যতম টার্গেট। এরইমধ্যে এ সংক্রান্ত চমকপ্রদ পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। প্রচারণার নানা বিষয় ব্যাপকভাবে শেয়ার হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এতে করে অন্তত অভিবাসীদের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনায়ও একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

/এমপি/টিএন/