সুইজারল্যান্ডের মতো বাংলাদেশও হতে পারে ট্রানজিটের দেশ।একদিকে ভারত ও আরেকদিকে চীনের মতো দুটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির মিলনস্থল হতে পারে এ দেশ।এতে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক লাভের অংক কষছে না সরকার বরং আরও বড় আকারে উন্নয়ন ও সামাজিক বিষয়গুলোও এতে প্রাধান্য পাবে।এজন্য সংযোগ বা কানেকটিভিটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
পররাষ্ট্র সচিব এম শহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন কানেক্টিভিটিকে বড় পরিসরে চিন্তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উপাদানই এখানে শুধু বিবেচ্য বিষয় নয় এরসঙ্গে মানব কল্যাণ ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে প্রাক্তন অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি হলে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উভয়ই বৃদ্ধি পাবার কথা। তবে এর সর্বোচ্চ সুবিধা পাবার জন্য এ সংক্রান্ত যোগাযোগ প্রকল্পগুলির দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন কূটনৈতিক প্রয়াসও এর জন্য জরুরি। তবে ভারত-পাকিস্তান বৈরী সম্পর্ককে পুরো এলাকাটির কানেক্টিভিটি তৈরিতে একটি বড় অন্তরায় বলেও মনে করেন তিনি।
এছাড়া বাংলাদেশ যদি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় তবে ভারতের ওপর দিয়ে করতে হবে আর এ জন্য ভারতের অনুমোদন লাগবে। আর পুরো বিষয়টির জন্য কূটনীতিক প্রয়াসের প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ করতে চাই।
তিনি বলেন, কানেক্টিভিটি মানে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা ব্যবসায়িক লাভ-লোকসানের হিসাব নয় আমরা এটিকে সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচনা করছি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রথাগতভাবে কানেক্টিভিটি মানে পণ্য আদান-প্রদান বলে মনে করা হতো। তবে এখন এ ধারণা পাল্টে গেছে। এখন এটিকে আরও বৃহৎ পরিসরে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আর এতে এখন আর্থিক অসমতা, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়গুলিও আলোচিত হয়।
বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এটিকে একটি আকর্ষণীয় যোগাযোগ অঞ্চল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে সহায়তা করবে। প্রসঙ্গত বাংলাদেশের একদিকে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ আর বঙ্গোপসাগরের অপর প্রান্তে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপরাপর দেশগুলি।
বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক জোট ও কানেক্টিভিটি উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সার্ক ও বিমসটেকের সদস্য হওয়া ছাড়াও বিবিআইএন, বিসিআইএম, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে ও এশিয়ান হাইওয়ে উদ্যোগের সঙ্গেও বাংলাদেশ জড়িত।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এ উদ্যোগগুলো অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত হলেও এগুলি ধারণা, জ্ঞান, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি আদান-প্রদানে সহায়তা করবে এবং এর ফলে লাভবান হবে মানুষ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, কানেকটিভির কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, দুই বছর আগের তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে বর্তমান এ শিল্পের কোনও মিল নেই।
তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন, দায়িত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আচরণ, ব্যবসায়ের সামাজিক দায়িত্ববোধ নতুন ধারণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করে দিচ্ছে।
আঞ্চলিক ক্ষেত্রেও এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে যে ধরনের সহযোগিতা করছে সেটি আগে চিন্তাও করা যেতো না।
বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে যেটি সাত বছর আগে কেউ চিন্তাও করেনি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার জ্বালানি সহযোগিতার জন্য আলোচনা করছে এটিও আগে কখনও হয়নি।
কর্মকর্তাটি বলেন, সরকার আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব বোঝে এবং এর সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে অবকাঠামো তৈরি এবং যোগাযোগ খাতে বিশেষ বিনিয়োগ করতে হবে।
পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আসবে এবং এর সুফল সারাদেশ পাবে বলে ওই কর্মকর্তা মনে করেন।
তিনি বলেন, বিবিআইএন এবং বিসিআইএম সড়ক করিডর প্রতিষ্ঠিত হলে অনেক নতুন সমৃদ্ধশালী অঞ্চল তৈরি হবে এবং এর ফলে সুফল পাবে এ অঞ্চলের জনগণ।
/টিএন/
আপ-এসটি