পৌরসভা নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে সুজনের সংশয়

sujon-logoআসন্ন পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও অর্থবহ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে নাগরিক অধিকার বিষয়ক সংগঠন সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)। কোনও কোনও এলাকায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, অন্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগের কর্মীদের বাধার কথা উল্লেখ করে তারা এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচনের বেশির ভাগ প্রার্থী ব্যবসায়ী হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে ‘পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তথ্য প্রকাশ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এই সংশয়ের কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আমরা অনেক অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের কথা জেনেছি। সর্বশেষ তিনটি নির্বাচন নিয়ে অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে তাই আশাবাদী হওয়ার দুরূহ।’
তিনি বলেন, ‘কোনও কোনও এলাকায় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি কোথাও কোথাও প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার দলীয় প্রার্থীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার সঠিক তদারকির দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আর যাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠছে, তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা উচিত।’
নির্বাচন চলাকালে নিরাপত্তা দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন কতটুকু কার্যকর তা নিয়েও সংশয় জানান বদিউল আলম। তিনি বলেন, ‘অতীতে সেনাবাহিনী নিয়োগের পরও ব্যারাকে বসিয়ে রাখতে দেখেছি। মোতায়েনের পরও কাজে লাগানো হয়নি তাদের। এটা সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তির জন্যে ক্ষতিকর।’
ব্যবসায়ীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার অবশ্যই তাদের আছে। কিন্তু তার সীমাও আছে। সিংহভাগ প্রার্থী যদি ব্যবসায়ী হন, জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পায় না। এই পৌরসভা নির্বাচনে মোট মেয়র প্রার্থী ৯০৪ জন। তাদের মধ্যে ৬৫২ জন ব্যবসায়ী যা মোট প্রার্থীর প্রায় ৭২ শতাংশ।

মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২২১ জনের মধ্যে ১৬৫ জন (৭৪.৬৬ শতাংশ) ব্যবসায়ী, বিএনপি’র ২০৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৬২ জন (৭৮.৬৪ শতাংশ) ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য রাজতৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ৪৭৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩১৫ জন (৬৮.১৩ শতাংশ) ব্যবসায়ী। 

সম্মেলনে সুজনের পরিচালিত এক পরিসংখ্যানের ফল তুলে ধরা হয়। পরিসংখ্যানটিতে পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা, তাদের বাৎসরিক আয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতার একটি সার্বিক চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। তবে কেবল প্রার্থীদের হলফনামা থেকে তথ্যগুলো নেওয়া হয়েছে বলে এই পরিসংখ্যানটিকে সম্পূর্ণ বলে মনে করেন না বলে জানান সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

সুজনের পরিচালিত জরিপ অনুসারে ২০০৯ সাল থেকে পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের ৩৩  মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৭৪টি, বিএনপির ৯৬ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৩১২টি ও অন্যান্য ৯০ প্রার্থীর নামে ২৯১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া ২০০৯ সালের আগে আওয়ামী লীগের ১০২ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৩০৩টি, বিএনপির ১০৯ প্রার্থীর মধ্যে ৩১০টি ও অন্যান্য ১১০ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৩৩৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

হলফনামায় দেওয়া বাৎসরিক আয়ের হিসেব অনুযায়ী আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে বছরে দুই লাখ টাকার কম আয় করেন ২৫ জন, দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা আয় করেন ১০০ জন, পাঁচ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয় করেন ৬২ জন, ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা আয় করেন ১০ জন, ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা আয় করেন তিন জন এবং এক কোটির ওপর আয় করেন পাঁচজন।

অপর দিকে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে বছরে দুই লাখ টাকার কম আয় করেন ২৬ জন, দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা আয় করেন ১২৩ জন, পাঁচ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয় করেন ৩৯ জন, ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা আয় করেন পাঁচজন, ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা আয় করেন তিনজন এবং এক কোটি টাকার ওপর আয় করেন আটজন।

হলফনামায় উল্লিখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের ২১১ প্রার্থীর মধ্যে মাধ্যমিক অনুত্তীর্ণ ৪০ জন, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ৩০ জন, উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ সাতজন, স্নাতক ৬১ জন ও স্নাতকোত্তর ২৯জন। শিক্ষা বিষয়ে কোনও উল্লেখ নেই চারজনের।

অপরদিকে বিএনপির ২০৬ প্রার্থীর মধ্যে মাধ্যমিক অনুত্তীর্ণ ৪০ জন, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ২৫ জন, উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ৫৩ জন, স্নাতক ৫৬ জন ও স্নাতকোত্তর ২৭ জন। শিক্ষা বিষয়ে কোনও উল্লেখ নেই পাঁচজনের।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের মেয়র প্রার্থীরা নিজ দল মনোনীতদের উত্তম দাবি করলেও সুজনের পরিসংখ্যান বলছে, মামলা, বাৎসরিক আয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করার অবকাশ খুব একটা নেই।

/ইএইচএস/এসআইএস/ এইচকে/এফএস/