ঘূণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরা উপকূলের অনেক এলাকার বেড়িবাঁধ মেরামত করতে না পারায় এখন পর্যন্ত প্লাবিত লোকালয়ের মধ্যেও জোয়ার-ভাটা চলছে। ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে আপামর জনতাকে। স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে রিং বাঁধ নির্মাণের কাজও চলছে। তবে বড় ঢল নামলে স্রোতে তা ভেসে যাবে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা মনে করছেন, দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা না হলে নদীগর্ভে বিলীন হবে উপকূলের অনেক গ্রাম।
জানা গেছে, ঘূণিঝড় আম্পানে শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি ও আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের অধিকাংশ বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। বাঁধগুলো স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করার উদ্যোগ গ্রহণের ২৩ দিন অতিবাহিত হলেও অনেকে এলাকায় এখনও বাঁধ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আবার অনেক এলাকায় এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও নদীর প্রবল জোয়ারের চাপে ভেঙে গেছে। এতে করে এখনও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কাশিমাড়ি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা ও পদ্মপুকুরের বন্যতলা ও আশাশুনির প্রতাপনগর ও শ্রীউলার লোকালয়ে জোয়ার-ভাটা হচ্ছে। এদিকে দেবহাটার সীমান্ত নদী ইছামতির বাঁধ ভেঙে অন্তত পাঁচটি গ্রাম প্লাবিত হয়। এছাড়া তালার পাখিমারা বিলের টিআরএম বাঁধে ভেঙে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
আশাশুনির প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরার মধ্যে বাঁধ ভেঙে তার ইউনিয়ন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪০ কিলোমিটার বাঁধের সব নষ্ট হয়ে গেছে। আম্পানে খোলপেটুয়া নদীর চাকলা, দিঘলারআইট, সুভদ্রাকাটি, রুইয়ারবিল, কুড়িকাহুনিয়া, হিজলিয়া কোলাসহ বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রিং বাঁধ দেওয়া হলেও প্রবল জোয়ারে অধিকাংশ বাঁধ বেঙে এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এখনও নদীতে জোয়ার হলে পুরো ইউনিয়নের লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে, ভাটায় সেই পানি নেমে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁশ ও বস্তা দেওয়া ছাড়া কোনও সহযোগিতা করেনি। চাকলা, কুড়িকাহুনিয়া, হরিষখালি পয়েন্টে বড় বড় ভাঙন দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। দ্রুত স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করলে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে এই হারিয়ে যাবে প্রতাপনগর ইউনিয়নসহ উপকূলের অনেক এলাকা।
তিনি আরও বলেন, 'প্রতিবছর জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে আশাশুনি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ১৯৯৫ সালে আশাশুনির বলাবাড়িয়ায় বাঁধ ভাঙার পর থেকে প্রতিবছর ভাঙনের কবলে পড়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হলেও কাজ হয় না। পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে নাকাল হয়ে পড়ে এই জনপদের মানুষ। ঝড়ে ক্ষয়-ক্ষতি না হলেও বেড়িবাঁধ ভেঙে জীবন ও সম্পদ হারায় তারা। অনেক মানুষ বাঁধের ওপর ছাপড়া তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে।'
শ্যামনগরের কাশিমাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ বলেন, 'আম্পানে খোলপেটুয়া নদীর ৬টি পয়েন্টে ২ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। কিন্তু ছোট ছোট দুটি স্থান ছাড়া ভেঙে যাওয়া অধিকাংশ স্থানের বাঁধ মেরামত করা যায়নি। পরে স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে রিং বাঁধ দেওয়া হলেও জোয়ারের পানিতে চিংড়িখালি খালের চার ফিট বাঁধ ভেঙে পুরা ইউনিয়ন আবারও প্লাবিত হয়েছে। এখনও এলাকায় জোয়ার-ভাটা হচ্ছে। কাশিমাড়ি ইউনিয়নের ঝাঁপালির চিংড়িখাল ও খোলপেটুয়া নদীর ওয়াপদা বাঁধের ১০টি গ্রামের এবং কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের তিন গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফলে নদীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে রীতিমতো জোয়ার-ভাটার মধ্যে বসবাস করছে উপকূলীয় দুর্গত জনপদের হাজারও পরিবার।
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, আম্পানের পর লেবুবুনিয়া, নাপিতখালি ও জেলেখালি এলাকায়র বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এই ইউনিয়নের মোট ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ২০ কিলোমিটার ভেঙে যায়। এলাকারবাসীকে সঙ্গে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে রিং বাঁধা হয়েছে। তারপরও সেগুলো টিকছে না। মাঝে মধ্যে ভেঙে বাঁধ ও জোয়ারের পানি উঠে এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং জোয়ার-ভাটায় পানি ওঠানামা করছে।
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসএম আতাউর রহমান জানান, আম্পানে তার ইউনিয়নের বন্যতলা, কামালকাটি, ঝাপা, ছোট চন্ডীপুর, পূর্ব পাতাখালি, পশ্চিম পাতাখালি, খুঁটিকাটা ও চাউলখোলা পয়েন্টগুলোর বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। মোট ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ২৪ কিলোমিটার ভেঙে যায়। এসব এলাকার বাঁধগুলো স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে পানি ঠেকাতে রিং বাঁধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে বন্যা তলার বাঁধ ভেঙে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তাই সবার আগে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ সংস্কার জরুরি। নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলেই যে কোনও মুহূর্তে রিং বাঁধ ভেঙে আবারও এলাকা প্লাবিত হবে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনম আবুজার গিফারী বলেন, 'আম্পানের ক্ষতিগ্রস্ত শ্যামনগরের বাঁধগুলোয় এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে রিং বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু পদ্মপুকুর ইউনিয়নের একটি পয়েন্টে ও কাশিমাড়ি ইউনিয়নের দুটি পয়েন্টে রিং বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। তবে সব জায়গায় কাজ চলছে। গাবুরার লেববুনিয়া বাঁধ ছাপিয়ে মাঝে মধ্যে পানি চলে আসে। এই পয়েন্টে খুব দ্রুত সেনাবাহিনী কাজ শুরু করবে। এছাড়া যারা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছেন, তাদের সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।'
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা বলেন, 'আম্পানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়নে। প্রতাপনগরের পুরো ইউনিয়নের মানুষ এখনও পানিবন্দি। প্রতাপনগরের চাকলা, শুভদ্রাকাটি, কুড়িকাহুনিয়া, কোলা, হরিষখালি, হিজলাসহ ৬টি পয়েন্টে ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। পরে স্থানীয়দের সহয়তা রিং বাঁধ দেওয়া হলেও সেগুলো আবারও ভেঙে এখন পর্যন্ত ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। তাদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'শ্রীউলা ইউনিয়নের হাজরাখালিতে অনেক গভীর হওয়ার কারণে রিং বাঁধ সম্ভব হচ্ছে না। হাজরাখালি বাঁধ ভাঙার কারণে মাড়িয়ালা, লাঙ্গল, দাড়িয়া, কলিমাখালিসহ ১০টি গ্রামে এখনও জোয়ার-ভাটা হচ্ছে। আশাশুনি সদর ইউনিয়নের জেলেখালি, দয়ারঘাট, বলাবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। অধিকাংশ স্থানে রিং বাঁধের কাজ চলছে। মূল বাঁধের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে আশাশুনি সদরের দয়ারঘাট ও বলাবাড়িযায় কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ এখনও শুরু হয়নি। তারা বস্তা ও বাঁশ দিচ্ছে। যেসব মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন, তাদের টিআর বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।'
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, জেলায় সড়ক ও জনপদের ৮১ কিলোমিটার রাস্তা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫৭.৫০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়েছে। ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।