যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র এখনও বিপৎসীমার ওপরে, জামালপুরে পানিবন্দি ১০ লাখ মানুষ

জামালপুরে বন্যার পানিতে ডুবে গেছে ঘর

যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি এখনও বিপৎসীমার ওপরে। তবে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে পানি। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৮৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি জামালপুর ফেরীঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ১ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে এ পর্যন্ত জেলার ৫৯ টি ইউনিয়নের ৬৭৭ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন জেলার ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭০৭ জন মানুষ। সোমবার ( ২০ জুলাই) বিকাল ৫ টায় জামালপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানি পরিমাপক (গেজ রিডার) আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো.নায়েব আলী জানান, বন্যায় নদী ভাঙনের কারণে ৩৮৩টি ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়াও বন্যায় ১৩ হাজার ৭৩৮টি বাড়ি-ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি জানান, বন্যায় ৬৬ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ও ১৯৪ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় ৪ হাজার ৫১৯টি নলকূপ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যায় ২৬৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৬৫৮টি মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ও মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জামালপুরে পানিবন্দি মানুষ

জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী আরও জানান, বন্যায় এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪০৮. ৫৭০ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল, ৬১০ মেট্রিক টন জিআর চাল, ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জিআর ক্যাশ, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ২ লাখ টাকার গোখাদ্য, ২ লাখ টাকার শিশু খাদ্য বরাদ্দ আসে। পর্যায়ক্রমে এসব বিতরণ করা হচ্ছে। ত্রাণের যোগ্য সকল বানভাসীকে ত্রাণ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কায়সার মুহাম্মদ মঈনুল হাসান জানান, এবারের বন্যায় জেলার দুই হাজার ৭৩৪টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে ও পুকুরগুলোর অবকাঠামো ভেঙে গেছে। এতে দুই হাজার ৩৩৫ জন মৎস্যচাষির ৯ কোটি ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।

ইসলামপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, এ উপজেলায় বন্যাদুর্গত ৩টি ইউনিয়নের ২২টি গ্রামে এক হাজার বন্যার্তদের মাঝে হাতে বানানো রুটি ও খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও দুর্গত এলাকায় অনেক নলকূপ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আমরা আক্রান্ত মানুষদেরকে বিশুদ্ধ পানিভর্তি গ্যালন সরবরাহ করছি।

কৃষিসম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো.আমিনুল ইসলাম জানান, বন্যার পানিতে ১১ হাজার ১৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। নিমজ্জিত এসব ফসলের মধ্যে পাট ৫ হাজার ২৮০ হেক্টর, আউশ ধান দুই হাজার ৬৯৪ হেক্টর, রোপা আমন বীজতলা এক হাজার ৯১৪ হেক্টর, সবজি ৯৬০ হেক্টর, মরিচ ৮৫ হেক্টর, কলা ৩১ হেক্টর, আখ ৩০ হেক্টর এবং ভুট্টা ২০ হেক্টর। তিনি বলেন, বন্যার পানি ধীরগতিতে নামার কারণে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

জামালপুরে পানিতে তলিয়ে গেছে মাঠের ফসল, পানি ঢুকেছে ঘরবাড়িতে

অপরদিকে বন্যার পানিতে চার হাজার ৫১৯টি নলকূপ ডুবে যাওয়ায় দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় গো-খাদ্যের অভাব দেখা দেওয়ার পাশাপাশি অসুস্থ গবাদি পশুর চিকিৎসার অভাবও দেখা দিয়েছে। ইসলামপুর উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের বৌশেরগড় গ্রামে খালেক মন্ডল, বারেক শেখ প্রমুখ জানান, বন্যার পানির কারণে তাদের গরুগুলো নোয়ারপাড়া

ইউনিয়নের উলিয়া ব্রিজের ওপর রাখা হয়েছে। কিন্তু গোখাদ্যের তীব্র অভাবে তাদের গরুগুলো না খেয়ে শুকিয়ে গেছে। জামালপুর সদর উপজেলার জামিরের চর গ্রামের দুধ বিক্রেতা মো. করিম সেখ জানান, তার গরুর চর্ম রোগ দেখা দিলেও পশু ডাক্তারের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

জামালপুরে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে বন্যার পানি

এ ব্যাপারে জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. এস, এম উকিল উদ্দিনের সঙ্গে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানান, কুড়িগ্রাম ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় তৃতীয় দফা বন্যা শুরু হয়েছে। এই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।