বগুড়ায় সোয়া লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি

বন্যাকবলিত এলাকাবগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় যমুনা ও বাঙালি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তৃতীয় দফা বন্যায় তিন উপজেলায় সোয়া লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সাহায্য অপ্রতুল হওয়ায় বন্যা দুর্গতরা খাদ্য, বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানান, বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তৃতীয় দফা বন্যা শুরু হয়েছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল ৬টায় সারিয়াকান্দির কুতুবপুর পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার এবং বাঙালি নদীর পানি ১২.৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। দুর্গতরা সহায়-সম্বল নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তাদের পাশাপাশি গবাদি পশুগুলোর খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় পাট, আউশ ধান, বাদাম, কাঁচা মরিচসহ মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডে দুটি নদীর পানি ঢুকে পড়েছে। এতে পৌরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তিন উপজেলায় পৌরসভাসহ ১৯ ইউনিয়নের ১৫৮ গ্রামে তলিয়ে গেছে। এতে সোয়া লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোনাতলা উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ৩২টি গ্রামের পাঁচ হাজার ৬৩৮ পরিবারের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও বন্যার কারণে লক্ষাধিক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দুর্গত এলাকাগুলো গোখাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

তেকানীচুকাইনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ শামছুল হক জানান, তার ইউনিয়নের সরলিয়া, মহনপুর, চুকাইনগর, খাবুলিয়া, জন্তিয়ারপাড়া, ভিকনেরপাড়া, মহব্বতেরপাড়া এলাকার প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অপরদিকে, যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে ৯টি চরের সাত শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

বাড়ি তলিয়ে গেছে তাই নৌকায় ঘর সংসারপাকুল্লা ইউপি চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান শান্ত জানান, তার ইউনিয়নের মির্জাপুর, রাধাকান্তপুর, বালুয়াপাড়া, পূর্বসুজাইতপুর ও খাটিয়ামারী গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, ইতোমধ্যে বানভাসীদের মধ্যে শুকনো খাবার, চাল, আলু, মুড়ি, ডাল, লবণ, মোমবাতি, দিয়াশলাই, স্যালাইন, বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সারিয়াকান্দি উপজেলায় দুটি নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। উপজেলার দেবডাঙ্গা ফিসপাস এলাকায় যমুনা ও বাঙালি নদীর দূরত্ব ২০০ মিটার। সারিয়াকান্দি পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১ নম্বর থেকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বাঙালি নদীর এবং অন্যগুলোতে যমুনা নদীর পানি প্রবেশ করেছে। এতে ওইসব এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জনগণ বাঁশ বেঁধে উপজেলা সদরে আসছেন। সদর ইউনিয়নের চর বাটিয়া গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় অধিকাংশ পরিবার বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। তবে কেউ কেউ এখনও সেখানে নৌকার ওপর বসবাস করছেন। সাহেদা ও জহুরুল প্রামাণিক দম্পতি এবং মামুন মিয়া পরিবার নিয়ে নৌকায় বসবাস করছেন।

এছাড়া নদীতে স্রোতের কারণে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের বরুরবাড়ি, নারচীর গাছবাড়ি, উত্তর গণভকপাড়া, গোদাগাড়ি, সদর ইউনিয়নের পাইকাপাড়া, চর গোসাইবাড়ি, কুতুবপুর ইউনিয়নের মাছিরপাড়া, ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের বাঁশহাটা গ্রামে বাঙালি নদীতে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ওইসব গ্রামে মাঠের পর মাঠ ফসলি জমি ও বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজাহার আলী মণ্ডল জানান, তিন দফা বন্যায় বগুড়ার তিন উপজেলায় ১৬২ গ্রামের ৩২ হাজার ৩৬ পরিবারের এক লাখ ২৮ হাজার ৭১৫ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিমাণ মানুষ পানিবন্দি আছেন।  সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত দুর্গতদের মাঝে জিআর আট লাখ টাকা, তিন হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য দুই লাখ টাকার, গবাদি পশুর খাদ্য বাবদ দুই লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার ও টাকা আছে। তাই বন্যা দুর্গতদের কোনও চিন্তার কারণ নেই।