পাটিসাপটা আর নাড়ুতেই আশার আলো শিলা রাণীর (ভিডিও)

শিলা রাণী দাসের তৈরি করা নাড়ু 
করোনাকালে কর্মহীন হয়েও নিজের প্রচেষ্টায় উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতার পথ খোঁজার চেষ্টায় দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছেন যশোরের মেয়ে শিলা রাণী দাস। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা স্বামী মানসসহ পরিবারের সদস্যদের উৎসাহে চলতিমাসের শুরুতে বাড়িতে বসেই তিনি তৈরি করছেন নানারকম পাটিসাপটা পিঠা আর নাড়ু। এগুলো তৈরি ও বিপণন করে এখন আশার আলো তার চোখেমুখে।

যশোর শহরের বেজপাড়া শ্রীধরপুর এলাকায় একটি ভাড়াবাড়িতে বসবাস করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস ও স্কুলশিক্ষক শিলা রাণী দাস দম্পতি।

বৈচিত্র্যময় নাড়ু বানিয়ে বিক্র্রি করছেন শিলা

শিলা জানান, করোনাকাল শুরুর পর থেকেই তাদের বেসরকারি স্কুলটিতে সমস্যা দেখা দেয়। এমনিতেই মাস শেষে স্যালারি দেওয়া হতো কম। তারপর ম্যানেজমেন্ট জানিয়ে দেয়, জুন থেকে অর্ধেক বেতন দেওয়া হবে। সে কারণে একপ্রকার রাগ করেই চাকরি ছেড়ে দেন সেই মাসেই।

তিনি বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানোই ছিল মূলত আমার কাজ। নেশা হচ্ছে কবিতা আবৃত্তি। ছুটির দিনে বিকেলে মাঝেমধ্যে পিঠা-পায়েস তৈরি করে নিয়ে যেতাম বিবর্তন যশোরে। সহকর্মীরা আমার তৈরি পিঠা-পায়েস খুব ভক্তি নিয়ে খেতো, প্রশংসা করতো। প্রসঙ্গত: বিবর্তন হচ্ছে যশোরের একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন।

তার হাতে তৈরি পাটিসাপটা পিঠার সুনাম ছড়িয়েছে যশোর থেকে বিভিন্ন জেলায়।

স্কুলশিক্ষকের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর বাড়িতে অফুরন্ত অবসর। ভাল লাগতো না। স্বামী মানসও তার মতো বিবর্তন যশোরের কর্মী। তিনি বললেন, তোমার হাতের পিঠা-নাড়ু তো বেশ ভালো, সবাই পছন্দ করবে। ট্রাই করে দেখতে পারো।

শিলা জানান, সময় কাটানো আবার কিছু উপার্জনও হবে- এই বিষয়টিতে বেশ তাগাদা দেয় বিবর্তন যশোরের মেয়ে শর্মিষ্ঠা, তুপা, নিশি, এলিস। সবাই উৎসাহ দেয়, দিদি শুরু করো।

জুলাই মাসের ৪ তারিখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কিছু পাটিসাপ্টা আর নাড়ুর ছবি দিয়ে একটা আহ্বান জানাই- বলছিলেন শিলা। সেদিনই বিভিন্ন স্থান থেকে পরিচিতজনরা সাড়া দেন। ৫ জুলাই থেকে অর্ডার অনুযায়ী পিঠা ও নাড়ু তৈরি করে তা সরবরাহ শুরু করি।

নাড়ু বানান বিভিন্ন রকম। দামেও আছে রকমফের। তবে চাহিদাও বেশ।

পিঠা ও নাড়ু তৈরি করে বিপণন শুরু হলেও একটা নাম দেওয়া খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, নাম কী দেবো? অনেক কিছুই মনে আসে, কিন্তু মনের মতো লাগছিল না। এ বিষয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আহ্বান জানাই। একটি নাম আসে পিঠা শৈলী, পরে সেটিকে আরও নান্দনিক করে মানস নাম দেন- রসনা শৈলী। এখন ফেসবুকে একটি পেজও তৈরি করা হয়েছে ওই নামে।

শিলার পিঠা ও নাড়ু তৈরির সব উপকরণ বাজার থেকে সংগ্রহ করে দেন মানস। তিনি বলেন, গত ১৫ দিনে দুই মণেরও বেশি দুধ, একশ’য়েরও বেশি নারকেল কেনা হয়েছে।

পাটিসাপটারও আছে রকমফের। দামেও ভিন্নতা।

মানস এখন প্রায়ই বাড়িতে বসে অফিসের কাজ করেন। আর তাদের তৈরি পণ্য বাজারজাতকরণসহ ছোটখাট কাজ করে দিচ্ছেন।

মানস জানান, আমরা ব্যবসা না বুঝলেও নান্দনিকতা বুঝি। এখন এসব পিঠা ও নাড়ু বিপণনে বাঁশের তৈরি ছোট ছোট বাস্কেট বানানোর কাজ করা হচ্ছে। যাতে করে পিঠা ও নাড়ু যশোরের বাইরে পাঠানো যায়। সেক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহারটা কমবে।

নিজেদের ছোট প্রচেষ্টার নাম দিয়েছেন ‘রসনাশৈলী’।

যশোরের মেয়ে শিলা খুব ছোটবয়সে তার দিদিমায়ের কাছ থেকেই শিখেছেন এসব পিঠা-পুলি তৈরির কাজ। মা-শাশুড়িও বানাতেন মজার মজার নানা ধরনের পিঠা। রক্তের সঙ্গে মিশে আছে এই অঞ্চলের কৃষ্টি-কালচার। সেকারণে এইসব নান্দনিক, দৃষ্টিনন্দন, সুস্বাদু পিঠা-পুলি তৈরিতে বেশি একটা বেগ হতে হয়নি তাকে।

শিলা বলেন, প্রথমদিকে বেশ ভয়ে ভয়ে ছিলাম। কিন্তু প্রথম সপ্তাহে বন্ধু, স্বজনদের আগ্রহে সেই ভয় কেটে যায়। এখন ঢাকা, বাগেরহাট, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন চাহিদা জানানো হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো তৈরি করে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

করোনাকালের উদ্যোক্ত শিলা রাণী দাস

গুণগতমান আর পরিশুদ্ধতার সঙ্গে কোনও আপস নেই জানিয়ে তিনি বলেন, কাঁচামালের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচও একটু বেড়েছে। সেকারণে আমার তৈরি পিঠা বা নাড়ুর দাম একটু বেশিই মনে হচ্ছে। আর স্বাদের কথা মাথায় রেখে ক্রেতারা তাতে ছাড় দিচ্ছেন।

এখন প্রতিদিন গড়ে দু’কেজির বেশি নাড়ু আর ৩০-৩৫টি করে পাটিসাপ্টা পাঠাচ্ছি- বলেন শিলা।

শিলা রাণীর নাড়ু ও পাটিসাপটার রেটকার্ড

শিলা- মানসের ঘরোয়া প্রতিষ্ঠান রসনাশৈলীতে দেশের যেকোনও স্থান থেকে অর্ডার দেওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে কুরিয়ার ও প্যাকেজিং খরচ এক্সট্রা দিতে হবে গ্রাহককে।

শিলা রাণী দাসের তৈরি নাড়ু খেতে চাইলে অর্ডার দিতে পারবেন যে কেউ।

শিলা জানান, তার তৈরি পাটিসাপটা সর্বনিম্ন ১০ পিস করে অর্ডার দিতে হয়। এমুহূর্তে সন্দেশ পুর, নারকেল পুর, ক্ষীরসা পুর ও ক্ষীর পুরের চার ধরনের পাটিসাপ্টা বানাচ্ছেন তিনি। দাম ২৬০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকার মধ্যে। এই দামেই ১০ পিস পাটিসাপ্টা পাওয়া যাবে। সঙ্গে ক্যুরিয়ার ও প্যাকেজিং খরচ যোগ হবে। অচিরেই ক্ষীরডুব নামে আরেকটি এক্সক্লুসিভ ধরনের পাটিসাপ্টা রসনাশৈলীর পণ্য তালিকায় যোগ করবেন তিনি। এক্সক্লুসিভ আর খুব স্বাদের হবে তাই দামটাও একটু বেশি পড়বে। আর তার তৈরি বিভিন্ন ধরনের নাড়ু পাওয়া যাচ্ছে ৬৫০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা কেজি দরে। গুড়, চিনি, ক্ষীরসা ও ক্ষীরের নাড়ু করছেন তিনি। দেশের যে কোনও প্রান্ত থেকেই ফেসবুকে অথবা তাদের সেলফোনে যোগাযোগ করে চাহিদা জানানো যাবে।

দেখুন ভিডিও: