কুড়িগ্রামের উলিপুরে চাঁদাবাজি ও অটোচুরির অভিযোগে পৌর শ্রমিক লীগের সভাপতি সোহেল খাঁসহ (৩৫) দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকালে তাদের গ্রেফতার করে উলিপুর থানা পুলিশ। এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে উলিপুর থানায় মামলা দায়ের করেছে ভুক্তভোগী এক অটোচালক। আসামিরা দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির নামে অভিনব কৌশলে উপজেলার কয়েকশ' অটোচালকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
উলিপুর থানার অফিসার ইন চার্জ (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের জুম্মাহাট গ্রামের রাশেদুল ইসলাম পেশায় একজন অটোচালক। তিনি উলিপুর বাজারে অটোরিকশা নিয়ে আসলে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের সহায়তায় উপজেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মুকুল মিয়া (৩৬) ও পৌর শ্রমিক লীগের সভাপতি সোহেল খাঁ (৩৫) সহ কয়েকজন মিলে তার ও অন্যান্য অটোচালকের কাছ থেকে অবৈধ ভাবে চাঁদা নিয়ে আসছিলেন।
তিনি মামলায় আরও উল্লেখ করেন, এক বছর পূর্বে তার কাছ থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ৫ হাজার ২শ’ টাকা চাঁদা আদায় করেন। গত ৩১ আগস্ট পুনরায় আসামিরা তার কাছে এক হাজার ৫০ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি বার বার চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করে তার অটোগাড়িটি তারা ছিনিয়ে নিয়ে যান। এ ঘটনায় তিনি মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকালে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমসহ শ্রমিক লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-১)। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই দিন পৌর শ্রমিক লীগের সভাপতি সোহেল খাঁ ও তার সহযোগী ফরহাদ হোসেনকে গ্রেফতার করে।
অটোচালক শামছুল আলম (৪০), মক্কেল আলীসহ (২৯) কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির নামে অভিনব কৌশলে উপজেলার প্রায় ৩ হাজার অটোচালকের কাছ থেকে গাড়ির নম্বর প্লেট বাবদ ৫ হাজার ২শ’ টাকা করে আদায় করা হয়। এভাবে অটোচালকদের কাছ থেকে এককালীন প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা আদায় করে নেন। এছাড়া ওইসব অটোরিকশা নবায়নের জন্য প্রতি বছর ১ হাজার ৫০ টাকা করে প্রায় ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করেন। এভাবে ১০ বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে প্রতিদিন ওই সংগঠনের নামে অটোপ্রতি ১০ টাকা করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। এভাবে মাসে ৯ লাখ ও বছরে প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা আদায় করে নিয়েছেন ওই নেতারা।
অভিযুক্তরা ক্ষমতাসীন দলের দাপট দেখিয়ে তার এ অবৈধ চাঁদাবাজি করে আসছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অটোচালক অভিযোগ করে বলেন, এই চক্রটি অটোচালকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে জোরপূর্বক চাঁদাবাজি করে আসছেন। একটি নতুন অটো ক্রয় করতে খরচ হয় দেড় লাখ টাকা কিন্তু তা রাস্তায় চালাতে ওই সংগঠনের নামে বছরে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। উপজেলা সদর থেকে রাজারহাট সড়ক, মাঝবিল সড়ক, অনন্তপুর সড়ক, ফকিরেরহাট সড়ক, বজরা ও থেতরাই সড়কসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অটো সিরিয়াল অনুযায়ী চালানোর নামে ওই সংগঠনকে অটোপ্রতি ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদা আদায়ের জন্য নেতারা গড়ে তুলেছেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী। চাঁদা না দিলে ক্যাডাররা মারধরসহ অটোর ব্যাটারি, সিট, স্পেয়ার চাকা খুলে নেয়। এভাবেও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওই নেতারা। অথচ এই সংগঠনেরও কোনও বৈধতা নেই।
তারা আরও বলেন, বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির নাম দিয়ে সংগঠন খোলা হলেও এর মূলহোতা জাহাঙ্গীর আলম, মুকুল মিয়া ও সোহেল খাঁ কিন্তু অটোরিকশার চালক বা মালিক নন। তাদের সঙ্গে অটোরিকশা ও এর মালিক চালকদের কোনও সংশ্লষ্টতাই নেই। অথচ এই চাঁদাবাজরা আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক লীগের নাম ভাঙিয়ে দাপট দেখিয়ে এ চাঁদা আদায় করছেন। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে গরিব অটোচালকদের জিম্মি করে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করে আসলেও এসব দলীয় ক্যাডারদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ কথা বলার সাহস পেত না। তারা শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটি নাম দিলেও কোনও শ্রমিক এই সংগঠন থেকে উপকৃত হয়নি। করোনার সময়েও এই সংগঠন শ্রমিকদের কল্যাণে কোনও সহায়তা করেনি অথচ অটোরিকশা শ্রমিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।
তাদের প্রশ্ন, স্বাধীন বাংলাদেশের রাস্তায় গাড়ি চালাতে কি সরকারের বাইরে অন্য কাউকে এভাবে ট্যাক্স দিতে হবে? সরকার তো লাইসেন্সও দেয় না, ট্যাক্সও নেয় না। তাহলে সরকারি দলের নেতারা কার প্রভাবে এভাবে চাঁদাবাজি করে? ট্যাক্স দিলে আমরা সরকারকে দেবো কিন্তু আর কোনও চাঁদাবাজকে দেবো না।
উলিপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা গোলাম হোসেন মন্টু বলেন, অবৈধভাবে দরিদ্র অটোচালকদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়া অন্যায়। এটা দলীয় কোন কার্যক্রম নয়, এটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়।
তিনি আরও বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে আমাদের কোনও দায়-দায়িত্ব নেই। আওয়ামী লীগ কখনোই চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা নেতৃবৃন্দকে অবহিত করা হয়েছে।’
ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অটো চালকদের কাছে কেউ চাঁদা দাবি করলে তা থানায় জানালে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটি নামে যে সংস্থার হয়ে চাঁদা ওঠানো হচ্ছে সেটির প্রধান কার্যালয় হিসেবে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের। আদৌ সেখানে এই নামে কোনও সংস্থা আছে কিনা আর এর যে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে তা আদৌ সঠিক কিনা তা কেউ কখনও যাচাই করেও দেখেনি।