ঘুষ দেওয়া ১৫ লাখ টাকা ফেরত পেতে আবারও সেই মা-মেয়ের অনশন

 



অনশনে মৌমিতা খাতুন পলি ও তার মা মেহেরপুরের গাংনী পৌর মেয়রকে ঘুষ দেওয়া ১৫ লাখ টাকা ফেরতের দাবিতে আবারও অমরণ অনশনে বসেছেন মৌমিতা খাতুন পলি ও তার মা। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে গাংনী উপজেলা পরিষদ শহীদ মিনার চত্বরে অনশনে আছেন তারা। মৌমিতা খাতুন পলি গাংনী পৌর এলকার শিশিরপাড়া গ্রামের শাহাবুদ্দিন ওরফে বাহাদুরের ছেলে মোমিনের স্ত্রী। 






মৌমিতা খাতুন পলি জানান, গাংনী পৌরসভায় সহকারী কর আদায়কারী পদে নিয়োগের জন্য পৌর মেয়র আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। জামি-জমা বন্ধক রেখে, ধারদেনা’সহ বিভিন্ন এনজিওর কাছে চড়া সুদে টাকা নিয়ে মেয়রকে দেন। মেয়রের কথা মতো ২০১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ইসলামি ব্যাংক মেহেরপুর শাখায় মেয়রের স্ত্রী জেলা পরিষদ সদস্য সাহানা ইসলাম শান্তনার ৬৪৫৪ নম্বর (হিসাবে) অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ ৭০ হাজার, ২৫ জানুয়ারি ৫০ হাজার এবং ৫ ফেব্রয়ারি ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা জমা দেন। বাকি টাকা দেন নগদে।

এরপর ২০১৮ সালের ১৯ মে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও তাকে নিয়োগ না দিয়ে অন্য আরেকজনকে সহকারী কর আদায়কারী পদে নিয়োগ দেন মেয়র আশরাফুল। নিয়োগ না দেওয়ায় টাকা ফেরত চেয়ে বারবার তাগাদা দিলেও কোনও কর্ণপাত করেননি মেয়র। উল্টো মারধর ও হুমকি দিয়ে তাকে পৌরসভা থেকে বের করে দেয়। তাই বাধ্য হয়ে বিচার চেয়ে গত ২০ আগস্ট বিকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গাংনী শহীদ মিনারে অনশন করেন। পরে গাংনী থানার ওসি বিচারের আশ্বাস দিলে বাড়ি ফিরে যান।

বিষয়টি নিয়ে গত ২১ আগস্ট রাতে গাংনী থানা চত্বরে পৌর মেয়র আশরাফুল ইসলামের উপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে গাংনী উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক, গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওবাইদুর রহমান, সেকেন্ড অফিসার আহসান হাবিব, এস আই আব্দুল হান্নান, সাবেক এমপি মো. মকবুল হোসেনের একান্ত সহকারী সাহিদুজ্জামান শিপু, পৌর কাউন্সিলর মিজানুর রহমান, সাহিদুল ইসলাম, এনামুল হক, শ্রমিক নেতা মনিরুজ্জামান মনি, অভিযোগকারী মৌমিতা খাতুন পলি, তার মা, বাবাসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় পলির স্বামীকে নিয়ে বসে টাকা লেনদেনের বিষয়টি সমাধান করবেন মেয়র।

তবে মেয়র আশরাফুল ইসলাম পলির স্বামী মোমিনকে টাকা ফেরত দিয়েছেন দাবি করে বলেন, চাকরির জন্য নয়, জমি সংক্রান্ত বিষয়ে টাকা নেওয়া হয়েছিল। যখন নিয়োগ পরীক্ষা হয় তখন আমি মেয়রের দায়িত্বে ছিলাম না।
গাংনী উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক বলেন, থানায় সালিশে মেয়র জানায় পলির স্বামী মোমিন তার ডায়েরিতে স্বাক্ষর দিয়ে টাকা ফেরত নিয়েছেন।

অপরদিকে মোমিন টাকা ফেরত নেননি বলে মোবাইল ফোনে দাবি করেন। পরে সভায় সিদ্ধান্ত হয় যদি স্বাক্ষর ঠিক থাকে তাহলে মৌমিতা খাতুন পলি টাকা আর পাবে না। আর যদি স্বাক্ষর না মেলে তাহলে তাকে ১৫ লাখ টাকা ফেরত দিবেন মেয়র। পলির স্বামীর উপস্থিতিতে আবারও বৈঠক বসবে জানিয়ে সভা শেষ করা হয়। এরপর গত ২৮ আগস্ট পলির স্বামী মোমিন থানায় আসলেও মেয়র হাজির না হওয়ায় বৈঠক করা যায়নি। 
তবে পৌর কাউন্সিলর সাহিদুল ইসলাম বলেন, মেয়র চাকরির জন্য টাকা নিয়েছেন। যা পৌর পরিষদের অনেকেই জানেন।
পলির দাবি, চাকরির দেওয়ার নামে ঘুষ নিয়ে সেই টাকা মেয়র ফেরত না দেওয়ায় প্রথম দফা অনশন, তারপর সালিশ বৈঠক হলো। এরপরও কোনও কূল কিনারা না পেয়ে আজ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো অনশন শুরু করলাম। আমার গর্ভে সন্তান। টাকা না দেওয়ায় আমার স্বামী এখন আমাকে নিতে চাচ্ছে না। একমাত্র মৃত্যুই এর সমাধান। আমি আর উঠছি না। আমি ও আমার অনাগত সন্তান মারা গেলে আমাদের লাশ বাড়ি যাবে। 

গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম শাহনেওয়াজ বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওবাইদুর রহমান বলেন, অনশনের বিষয়টি জেনেছি। আমরা স্থানীয় ব্যাক্তিবর্গ মেয়য়ের সঙ্গে বসেছিলাম। বিষয়টি অমিমাংসিত রয়ে গেছে। এই বিষয়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় দেখছি না। তাদের নিরপত্তায় শদীদ মিনার এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। 
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় মেয়র আশরাফুল মুঠোফোনে জানান, চাকরির জন্য টাকা নিয়েছি প্রমাণ দিতে পারলে এখুনি মৌমিতাকে টাকা দিয়ে দেবো। একটি জমি কেনার জন্য আমার ফার্মে চাকরি করা মোমিন আমাকে ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়েছিল। কিন্তু পরে জমি না কেনায় অনেক আগেই সে টাকা ফেরত দিয়েছি। সেই মোমিন তার স্বামী কিনা জানি না। সামনে পৌর নির্বচনকে কেন্দ্র করে আমার প্রতিপক্ষ এই মা-মেয়েকে রাজনৈতিকভাবে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। তাদের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার কোর্টে মানহানির মামলা করবো।