চিকিৎসক সংকটে ইতোমধ্যে শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দুটি ওয়ার্ডের চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে গেছে। আর বেশিরভাগ ওয়ার্ডে ধার করা চিকিৎসক দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এছাড়া নার্স থেকে শুরু করে টেকনোলজিস্ট এবং তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদ শূন্য থাকায় এর প্রভাব পড়ছে রোগীদের ওপর। শূন্য পদ পূরণ করে রোগীদের শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা না হলে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন স্থানীয়রা।
মেডিক্যালের প্রশাসনিক দফতর সূত্র থেকে জানা গেছে, ১০ বছর আগে ৩৬০ শয্যার হাসপাতালকে এক হাজার বেডে উন্নীত করা হয়। করোনার আগে স্বাভাবিক দিনগুলোতে দুই হাজার থেকে ২২শ’ রোগী চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। কিন্তু হাসপাতালের জনবল রয়েছে সেই ৩৬০ শয্যারই। বর্তমানে ২২৪ চিকিৎসকের স্থলে ১২৮টি পদ বছরের পর বছর ধরেই শূন্য। ৯৭৫ নার্সের মধ্যে শূন্য ৪৫টি। টেকনোলজিস্টের ৪৩ পদের বিপরীতে ২৩টি এবং কর্মচারীদের ৪২৬টি পদের বিপরীতে ১৪৭টি শূন্য।
বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ ব্রাদার লিংকন জানান, ২০১৫ সালের ১২ মার্চ মেডিক্যালের নিচতলায় ৮টি বেড নিয়ে এই ইউনিটের পথচলা শুরু হয়। রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে সেখানে ৮ চিকিৎসক এবং ১৬ নার্স ও ব্রাদারের পদ রাখা হয়। শুরু থেকেই ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে ছিলেন সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. এম এ আজাদ সজল। গত এপ্রিলে ওই চিকিৎসকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর চিকিৎসক সংকটে ওই ওয়ার্ডটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে দায়িত্বরত নার্স ও ব্রাদার এবং কর্মচারীরা রুটিনমাফিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
ব্রাদার লিংকন আরও জানান, ওয়ার্ডটি চালু না থাকায় অগ্নিদগ্ধ রোগীরা মারাত্মক দুর্ভোগে আছেন। তাদের ঢাকায় চিকিৎসা নিতে যেতে হচ্ছে। হতদরিদ্র ঢাকায় না যেতে পারায় তাদেরকে সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন রোগীর স্বজনরা আসছেন ওয়ার্ডটি চালু হয়েছে কিনা জানতে।
গত এক বছর আগে মানসিক বিভাগের একমাত্র চিকিৎসক তপন কুমার সাহা অবসরে গেলে চিকিৎসক সংকটে ওয়ার্ডটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ওই ওয়ার্ডে যন্ত্রপাতির বাক্স রাখা হয়েছে।
এছাড়া মাত্র একজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে আইসিইউ। ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসক না থাকলে বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে ধার করে চিকিৎসক এনে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। অনেক সময় মোবাইলের মাধ্যমেও চিকিৎসা সেবা দিতে বাধ্য হন নার্সরা। এভাবে হাসপাতালের ৩৭টি ওয়ার্ডে চিকিৎসক সংকট থাকায় রোগীদের চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
একাধিক রোগীর স্বজনরা জানান, বড় চিকিৎসক একবার রাউন্ডে এসে ওষুধ লিখে দেন। কিন্তু এরপর আর তাদের পাওয়া যায় না। তাদের অনুপস্থিতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্স-ব্রাদ্রাররা একমাত্র ভরসা। তবে বড় চিকিৎসক প্রতিদিন দুই থেকে তিন বার রাউন্ডে এলে সবার জন্য ভালো হয়।
রোগীর স্বজনরা আরও জানান, কিছু কিছু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ থাকলেও ভেতরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ওয়ার্ডের বারান্দা ও হাঁটাচলার স্থানে রোগীদের জায়গা করে নিতে হয়। এতে করে চিকিৎসা সেবা তেমন ভালো হয় না। এজন্য ওয়ার্ডের পরিধি বাড়ানোর দাবি জানান তারা।
এ ব্যাপারে শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, শূন্য পদ পূরণ করে রোগীদের শতভাগ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা না হলে জনগণ বিদ্রোহ করলে সেখানে সরকারের কোনও কিছুই করার থাকবে না। তিনি চিকিৎসকের পদ পূরণের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান রোগী অনুযায়ী জনবল কাঠামো দেওয়ার দাবি জানান।
চিকিৎসক সংকটে ওয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মেডিক্যালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, 'এক হাজার রোগীর অনুমতি পেলেও সে অনুযায়ী জনবল দেওয়া হয়নি। পূর্বের জনবল দিয়েই চলছে এখানকার চিকিৎসা সেবা। এরপরও চিকিৎসকের শতভাগ শূন্য পদ পূরণ হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দুই হাজার রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নতুনভাবে অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। নতুন অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন করা হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।'