বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিবাদে মিছিল ও সমাবেশ ডাকা নিয়ে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ অনুষ্ঠানে বাধা দিতে অপরপক্ষ সমাবেশ মঞ্চ ভেঙে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১২২ রাউন্ড শর্টগানের ফাঁকা গুলি নিক্ষেপ করে। পরে ভাঙা মঞ্চেই হয় সমাবেশ। এরপর আবারও অপরপক্ষ সমাবেশে বাধা দিলে দুপক্ষে ফের সংঘর্ষ ঘটে। মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুর আড়াইটায় চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের হাজীগঞ্জ চৌরাস্তা এলাকায় শুরু হওয়া এ সংঘর্ষ চলে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চাঁদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ এ ঘটনায় উপজেলা যুবলীগকে দায়ী করেছে। তবে যুবলীগ এ দাবি অস্বীকার করেছে।
স্থানীয়রাসহ আওয়ামী লীগের দলীয় একটি অংশের দাবি, জাতির পিতার নামে সমাবেশ ডাকা হলেও উপজেলা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতৃত্বের কোন্দলে দুই পক্ষের কেউ কারও রাজনৈতিক কর্মসূচি মানতে নারাজ। তাই উপজেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে তা মানতে পারেনি বিবদমান অপর পক্ষ। ফলে তাদের নেতা-কর্মীরা দুপুরে সমাবেশ শুরুর আগেই সমাবেশ মঞ্চ ভাঙচুরের চেষ্টা চালায়। এসময় একুশে হাসপাতালসহ কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের গ্লাস ভাঙচুর করে এবং টায়ার, কাঠের টুকরা জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। পরে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ হাজীগঞ্জ পশ্চিম বাজারে গিয়ে রাফা টাওয়ারে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।
এসময় হাজীগঞ্জ থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের মহড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলে বিকালে বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে নেতাকর্মীরা ব্যানার ফেস্টুন হাতে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেয়। ওই সমাবেশে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. মাঈনুদ্দিনের পরিচালনায় ফোনোলাইভে যুক্ত হয়ে বক্তৃতা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মো. নাছির আহম্মেদ ভূঁইয়া ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটোয়ারী দুলাল। মোবাইল ফোনে তাদের দেওয়া বক্তব্য মাইকে জনগণ ও নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শোনানো হয়। এছাড়া মঞ্চে বক্তৃতা করেন হাজীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মো. হেলাল উদ্দিন মিয়াজী।
এদিকে, সমাবেশে বক্তৃতা চলাকালীন সময়ে পুনরায় মঞ্চকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে হামলাকারীরা। এতে সভাটি ভণ্ডুল হয়ে নেতাকর্মীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। এসময় দফায় দফায় চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। ওইসময় আহত বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তারপরই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. মাঈনুদ্দিনের নেতৃত্বে হাজীগঞ্জ বাজারে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয় নেতাকর্মীরা।
সাবেক পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শুকুর আলম শুভ বলছেন, ভাঙচুর ও হামলাকারীরা সাংসদ মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের নামে মিছিল নিয়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নামধারী একাংশ।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ওই সমাবেশের জন্য পুলিশের কাছে আগে থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি। তারপরও পুলিশ উভয়পক্ষকে নিবৃত্ত করার জন্য শুরু থেকেই চেষ্টা চালিয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাজীগঞ্জ সার্কেল) মো. আফজাল হোসেন জানান, দুপুরের পর থেকেই দু’টি পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে আড়াইটা থেকে গণ্ডগোল শুরু হয়। পরে আমরা খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। এক পর্যায়ে আমরা লাঠিচার্জ করি। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় শর্টগানের গুলি নিক্ষেপ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি। তিনি জানান, মারধর এবং ঢিলের আঘাতে তাদের অনেকেই আহত হতে পারেন।
তিনি বলেন, এই ঘটনায় পুলিশ যথাসময়ে দায়িত্ব পালন করেছে। বিশেষ করে হাজীগঞ্জ থানা পুলিশের পাশাপাশি চাঁদপুর থেকে দুই প্লাটুন পুলিশ ও দুইটি বিশেষ টিম কাজ করেছে। আমরা দুইপক্ষের সাথে কথা বলেছি। হাজীগঞ্জ বাজারের পরিবেশ শান্ত রাখার চেষ্টা করেছি।
সমাবেশ ও মিছিল শেষে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. মাঈনুদ্দিন বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের এ সমাবেশে নেতাকর্মীরা যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে না পারে সেজন্য তারা আমাদের কর্মসূচির প্রথম দিকেই হামলা চালায়। সভামঞ্চে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। বঙ্গবন্ধু এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার ছবি সম্বলিত ব্যানার পুড়িয়ে দেয়। তারপরও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আমাদের প্রায় ৪০ হাজার নেতাকর্মীকে নিয়ে ভাঙা মঞ্চেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচি সম্পন্ন করে প্রতিবাদ মিছিল করি।
তিনি বলেন যারা এই হামলা চালিয়েছে, তারা কখনও আওয়ামী লীগের লোক হতে পারে না। তারা বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার শত্রু। তিনি বলেন, এখানে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ, একটি সহযোগী সংগঠন এক ক্ষমতাধর নেতার ছত্রছায়ায় একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছে। এমন সন্ত্রাসী কার্যক্রম এই হাজীগঞ্জে আর কোনোদিন হতে দেবো না।
তবে হাজীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাসুদ ইকবাল ও যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন সোহেল বলেন, হাজীগঞ্জে বাজারে এই ঘটনায় যুবলীগের কোনও নেতা-কর্মী সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে জানতে পেরেছি, রাহী নামের একজনের সাথে সিগারেটের ধোঁয়া নিয়ে ফরহাদ নামের এক ছেলের বাগ-বিতণ্ডা হয়। তারই সূত্র ধরে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে।
তারা আরও বলেন, যদি কোনও ভিডিও ফুটেজ বা ছবিতে যুবলীগের কোনও নেতাকর্মীকে এই হামলায় সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ কেউ দিতে পারে, তাহলে আমরা তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।