প্রথম ধাপের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৮ ডিসেম্বর বরগুনার বেতাগী পৌরসভায় ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এবারই প্রথমবারের মতো দেশের বিভিন্ন জেলার পৌরসভার সঙ্গে বরগুনার বেতাগী পৌরসভা নির্বাচনেও ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এ ভোট দেবেন ভোটাররা। তবে যে যন্ত্রের মাধ্যমে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট ধারণা নেই অনেক ভোটারের। এর আগে বেতাগী উপজেলা কিংবা বরগুনা জেলার কোনও নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। তাই ভোটাধিকার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে না জানায় ভোট দেওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ভোটাররা।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে গঠিত প্রথম শ্রেণির বেতাগী পৌরসভার মোট ভোটারের সংখ্যা ৯ হাজার ২৭৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার চার হাজার ৫৪২ জন এবং নারী ভোটার চার হাজার ৭৩৫ জন। এবারের পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থীসহ তিন জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়াও সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৭ জন এবং নারী কাউন্সিলর পদে আরও ৯ জনসহ মোট ৩৯ জন প্রার্থী নির্বাচনে লড়াই করছেন।
সরেজমিনে বেতাগী পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, পুরো এলাকাজুড়ে এ মুহূর্তে ভোটের হাওয়া বইছে। নির্বাচনি মাঠে চলছে প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণা। প্রতিশ্রুতির ঝুড়ি নিয়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রার্থীরা। কিন্তু এসবের মধ্যেও এবছর যে প্রক্রিয়ায় ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে সেই ইভিএম সম্পর্কে অবগত নন সাধারণ ভোটাররা। এ আসনের ভোটারদের বেশিরভাগই শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের মানুষ। গত কয়েক দিনে অন্তত ৫০জন শ্রমজীবী ভোটারের কাছে ইভিএম সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা এবিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান।
বেতাগী লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দা সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বছর কাগজে টিপ-ছাপ দিয়ে ভোট দেই। কিন্তু এবছর মেশিনে ভোট হবে শুনেছি। দেখেছিও। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এখনো সিস্টেমটা বুঝতে পারি নাই। এবিষয়ে নির্বাচনের আগ থেকেই যদি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ক্যাম্পেইন করে ভোটারদের হাতে কলমে দেখানো হতো তাহলে আরও বেশি সহজ হতো।’
একই এলাকার বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘যারা শিক্ষিত তাদের জন্য ইভিএম পদ্মতিতে ভোট দেওয়া অনেক সহজ হবে। কিন্তু যারা কম শিক্ষিত কিংবা শিক্ষিত নন, তারা একটু বিপাকে পড়বেন। নির্বাচনের কমিশনের আগে থেকেই এবিষয়ে ভোটারদের ধারণা দিতে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা উচিত ছিল।’
প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে পৃথক লিফলেট বিতরণ করে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। তবে সেই প্রক্রিয়া কতটুক কাজে আসবে তা বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত। এছাড়াও নির্বাচন কমিশন থেকেও ক্যাম্পেইন করে ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বেতাগী উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বরগুনার বেতাগী পৌরসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ইভিএমে ভোট গ্রহণ বিষয় কর্মকর্তাদের দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেন রিটার্নিং অফিসার ও জেলা নির্বাচন অফিসার দিলীপ কুমার। সহকারী ট্রেইনার ছিলেন সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও বেতাগী উপজেলা নির্বাচন অফিসার সহিদুল ইসলাম, বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার নাজমুল হোসেন, আমতলী উপজেলা নির্বাচন অফিসার তারিকুল ইসলাম, পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাচন অফিসার আইয়ূব আলী। প্রশিক্ষণে ১০ প্রিজাইডিং, ৪৩ সহকারী প্রিজাইডিং ও ৮৬ জন পোলিং অফিসার অংশ নেন। তাদের ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বেতাগী পৌর নির্বাচনের রিটানিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা দিলিপ কুমার হাওলাদার বলেন, ‘প্রথমত আমরা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখাচ্ছি ইভিএম পদ্মতিতে কীভাবে একজন ভোটার তার পছন্দনীয় প্রার্থীকে ভোট দেবেন। সেই সঙ্গে স্থানীয় ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও আমরা এই বিষয়টি সম্পর্কে প্রচারণা চালিয়েছি। আজ ২৬ ডিসেম্বর দিনব্যাপী বেতাগী পৌরসভার ৯টি কেন্দ্রে মক ভোটের মাধ্যমে ইভিএম পদ্ধতিতে সরাসরি ভোট দিয়ে ভোটারদের হাতে কলমে শেখানো হয়েছে। এরপর ভোটারদের মধ্যে ইভিএম পদ্মতিতে ভোট দেওয়া নিয়ে কোন শঙ্কা থাকার কথা নয়।’
৯ কেন্দ্রে মক ভোট
বেতাগী পৌরসভায় ৯টি কেন্দ্রে মক ভোট অনুষ্ঠিত হয় আজ শনিবার। তবে কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে ভোটারদের উপস্থিতি তেমন একটা চোখে পড়েনি। অল্প কিছু সংখ্যক ভোটার ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া শিখতে আসেন। তবে যারা ভেঅট দিয়েছেন, তারা সহজেই ভোট দিতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
প্রথমবারের মতো ইভিএম এ ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতার বিষয়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার মিজানুর রহমান মজনু বলেন, ‘ইভিএমে ভোট দেওয়া কারও জন্যই কঠিন হবে না। খুব সহযেই আমি ইভিএম প্রক্রিয়ায় ভোট দিয়েছি।’
তিনি জানান, আজ মক ভোটে কোনও প্রতীকের ব্যবহার করা হয়নি।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আগের তুলনায় আধুনিক। এতে কন্ট্রোল ইউনিট ও ব্যালট ইউনিট নামের দুটি অংশ থাকে। কন্ট্রোল ইউনিট থাকবে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সামনে। ব্যালট ইউনিট থাকবে ভোট দেওয়ার জন্য নির্ধারিত গোপন কক্ষে। কন্ট্রোল ইউনিট কাজ ভোটার শনাক্ত করার। আঙুলের ছাপ, স্মার্ট কার্ড, আইডি নম্বর ও ভোটার নম্বরের মাধ্যমে ভোটার শনাক্ত করা সম্ভব। ভোটকেন্দ্র আসার পর ভোটার সনাক্ত হওয়ার পর তার আঙুলের ছাপ কন্ট্রোল ইউনিটে দেবেন। এরপর ভোটারের ছবিসহ অন্যান্য তথ্য কন্ট্রোল ইউনিট এবং ভোট কক্ষে রাখা মনিটরে দেখা যাবে। সব ঠিক থাকলে ওই ভোটার ভোট দিতে পারবেন। স্মার্টকার্ড দিয়েও তথ্য বের করা যাবে।