দিনাজপুরে গত সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯ জন করে আক্রান্ত হলেও চলতি ডিসেম্বর মাসে আক্রান্ত হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ১৬ জনেরও বেশি।
দিনাজপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে জেলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩১৬ জন, অক্টোবরে ২৫৫ জন এবং নভেম্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২৮১ জন। এই ৩ মাসের হিসেবে প্রতিদিন গড়ে আক্রান্তের হার ৯ দশমিক ২৬ জন। অথচ চলতি ডিসেম্বর মাসের ২৫ দিনেই জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪১৫ জন। যা আক্রান্তের হারে দৈনিক ১৬ জনেরও বেশি (১৬.৬৬)।
শুধু তাই নয়, ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে আক্রান্তের হার ১১.২৬ শতাংশে থাকলেও পরবর্তী সময়ে আক্রান্তের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭.৬১ শতাংশে। অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসে দিন যাওয়ার সাথে সাথেই বাড়ছে আক্রান্তের হার।
তথ্য বলছে, জেলায় প্রথম করোনা শনাক্ত হয়েছিল গত ১৪ এপ্রিল। প্রথম মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল ১৭ জন আর শনাক্তের হার ছিল ২.৬৯ শতাংশ। মে মাসে আক্রান্ত ২১০ জন আর শনাক্তের হার ছিল ৭.৫৫ শতাংশ। জুন মাসে আক্রান্ত ৩৮৬ জন আর শনাক্তের হার ছিল ১২.৫৪ শতাংশ, জুলাই মাসে আক্রান্ত ১ হাজার ৮০ জন আর শনাক্তের হার ছিল ২৪.৫৩ শতাংশ, আগস্ট মাসে আক্রান্ত ১ হাজার ৩৮৪ জন আর শনাক্তের হার ২৫.২৭ শতাংশ, সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্ত ৩১৬ জন আর শনাক্তের হার ১০.৮৪ শতাংশ, অক্টোবর মাসে আক্রান্ত ২৫৫ জন, শনাক্তের হার ৯.২৮ শতাংশ। গত নভেম্বর মাসে আক্রান্ত হয়েছিল ২৮১ জন আর শনাক্তের হার ১০.১৪ শতাংশ। চলতি ডিসেম্বর মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে শনাক্তের হার ছিল ১৫.৮৪ শতাংশ। শনাক্ত হওয়ার প্রথম থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই জেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ৪১৫ জন আর শনাক্তের হার ১৮.৩৪ শতাংশ।
হিসেব অনুযায়ী, জেলায় করোনা শনাক্তের আট মাস পার হলেও এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। উল্টো শনাক্তের হার বাড়ছে। গত ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই জেলায় মোট নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ২৮ হাজার ৪৮৭ জনের, যার মধ্যে পরীক্ষা করা হয়েছে ২৭ হাজার ২৬৩ জনের। মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৪৪৪ জনের। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৪ হাজার ১৫২ জন আর মারা গেছেন ৯৩ জন। বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৯৯ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১৫ জন। বাকি ১৮৪ জন রোগী হোম আইসোলেশনে রয়েছেন।
জেলায় এখন পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন ৯৩ জন। সবচেয়ে বেশি মৃতের সংখ্যা সদর উপজেলায় ৩৯ জন। এছাড়াও চিরিরবন্দরে ১০জন, ফুলবাড়িতে ৮, বীরগঞ্জে ৪, নবাবগঞ্জে ৩, হাকিমপুরে ১ এবং বিরল ও পার্বতীপুরে ৬জন করে, বিরামপুর ও কাহারোলে ৫ জন করে, বোচাগঞ্জ ও খানসামায় ৩ জন করে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত করোনায় কারও মৃত্যু হয়নি ঘোড়াঘাট উপজেলায়।
দ্বিতীয় ধাপের প্রস্তুতি
দ্বিতীয় ধাপে করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দিনাজপুর স্বাস্থ্য বিভাগ। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, করোনায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য জেলায় ৩৬৭টি বেড রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ বেড ৩৫৭টি এবং আইসিইউ বেড ১০টি। গত ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব বেডে মোট ১৫ জন রোগী রয়েছেন। রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ৩৬৪ জন চিকিৎসক ও ৮৭৩ জন নার্স পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের জন্য ৩৫টি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যেখানে একসাথে প্রায় দুই হাজার মানুষকে রাখা যাবে। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন করার কাজ চলমান। জেলার ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৪টি কনসেন্ট্রেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার সংখ্যা। এছাড়াও ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সদর উপজেলা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল এবং এম আব্দুর রহিম মেডিকেলে মোট ৮৬৮টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে।
স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কেমন
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার আগে থেকেই সর্বসাধারণের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ পরিপত্র জারি হয়েছে। তবে মাস্ক ব্যবহারে মানুষের উদাসীনতা রয়েই গেছে। শতভাগ মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ যেমন প্রচারণা চালাচ্ছে তেমনিভাবে কাজ করছে জেলা পুলিশ প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। এছাড়াও মাস্ক ব্যবহারে ভ্রাম্যমাণ আদালত চললেও যতক্ষণ চলে ততক্ষণই মানুষ মাস্ক ব্যবহার করে। এরপরে সেই আগের অবস্থায় ফিরে যায় বেশিরভাগ মানুষ। মাস্কের ব্যবহার অনেকের কাছে হয়ে গেছে থুতনিতে আটকিয়ে রাখা কিংবা পকেটে ভরে রাখা। শুধুমাত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনের লোকজনের সামনে তার উপযুক্ত ব্যবহার হয়।
মাস্ক ব্যবহার না করায় জেলা প্রশাসন থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রম পরিচালনায় গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৪৬৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে। এই কার্যক্রমে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৩২১টি এবং ১১ হাজার ৪০৮ জনকে অর্থদণ্ড করার মাধ্যমে ৮০ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩৪ টাকা আদায় করা হয়েছে।
শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত জেলার মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ড, বাহাদুরবাজার, লিলি মোড়, জেনারেল হাসপাতাল মোড়, বটতলা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষেরই নেই সচেতনতা। কেউ মাস্ক থুতনিতে আটকিয়ে রেখেছেন আবার কেউ পকেটে ভরে রেখেছেন। খোলা পরিবেশেই অনেকেই পানাহার করছেন।
কথা হলে বাহাদুরবাজার এলাকার রফিক উদ্দিন বলেন, মাস্ক আছে পকেটে। সবসময় পড়তে বিরক্ত লাগে তাই খুলে রেখেছি। তাছাড়া এখন করোনা তেমন নাই।
সিরাজুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, মাস্ক তো আছে। কিন্তু পড়তে সমস্যা, দম বন্ধ হয়ে আসে।
দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ও জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ডা. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, সব প্রতিষ্ঠান, সেবা সার্ভিস কিংবা সাধারণ দোকানেও ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ এবং ‘সেবা পেতে মাস্ক পড়ুন’ ব্যানার টাঙানো হয়েছে। এরপরও অনেকেই মাস্ক পড়ছেন না এবং তাদেরকে মাস্ক ব্যবহারে সচেতনতা করতে তথ্য অফিসের মাধ্যমে মাইকিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায় এবং ধুলার পরিমাণ বেড়ে যায়। যার কারণে এই সময়ে জীবাণু দ্রুত সংক্রমণ হয়। তাই এই সময়টাতে আমাদের সচেতন থাকা খুবই জরুরি। বর্তমানে মাস্কের কোনও বিকল্প নাই। বাড়ি থেকে বের হলেই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।