এক বছরে ১২০ কোটি টাকার মাদক, অস্ত্র, সোনা আটক যে সীমান্তে

গত ৬ সেপ্টেম্বর ঘিবা সীমান্তে উদ্ধার করা হয় অস্ত্রশার্শা ও বেনাপোলের বিভিন্ন সীমান্তে অভিযান চালিয়ে গত এক বছরে ১২০ কোটি টাকার মাদক, অস্ত্র, ডলার ও সোনাসহ বিভিন্ন চোরাচালান পণ্য আটক করেছে বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। এ সময় চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ৩৭৮ পাচারকারীকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাদক ও সোনা চোরাচালানে অল্প সময়ে বেশি অর্থ আয়ের আশায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে সীমান্তের সাধারণ মানুষ। সেইসঙ্গে অনেকে নিজেরাই চোরাচালানকারী গডফাদার সেজে অন্যদের দলে টেনে নিচ্ছে।

যশোর ৪৯ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সেলিম রেজা ও বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।বিজিবি’র জব্দ করা সোনার বার

জানা গেছে, শার্শা ও বেনাপোলের বিভিন্ন সীমান্তে পাচারকারীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় পাচারকারীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে। এরপর আবার জড়িয়ে পড়ে চোরাচালান ব্যবসায়। শার্শা-বেনাপোল সীমান্তের কায়বা, রুদ্রপুর, গোগা, অগ্রভুলাট, পাঁচভুলাট, শালকোনা, পাকশিয়া, ডিহি, শিকারপুর, রামচন্দ্রপুর এবং বেনাপোলের পুটখালী, দৌলতপুর, গাতিপাড়া, সাদিপুর, রঘুনাথপুর, ঘিবা ও ধান্যখোলা সীমান্তের পাচারকারীরা অনেক বেশি সক্রিয় বলে বিভিন্ন সূত্র জানায়।

শার্শা ও বেনাপোল সীমান্ত থেকে বিজিবি,পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে এক বছরের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও মাদকের মধ্যে রয়েছে ২৩টি বিদেশি পিস্তল, ৪১টি ম্যাগাজিন, ১০৫টি গুলি, প্রায় ৫৫ হাজার ৪৯৮ বোতল ফেনসিডিল, ৯৫৩ কেজি গাঁজা, ৫৫০ বোতল দেশি-বিদেশি মদ ও ১৮৫০ পিস ইয়াবা। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে প্রায় ৪১ দশমিক ৭৭২ কেজি স্বর্ণ ও সাত লাখ ৩৮ হাজার ডলার উদ্ধার করা হয়েছে।শার্শা সীমান্তে উদ্ধার করা ডলার

সীমান্তের সচেতন মহলের দাবি, শুধু বিজিবি, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর প্রচেষ্টায় মাদক পাচার রোধ করা কঠিন। যেহেতু ভারত থেকে মাদক আসছে, তাই সেদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। আর বিজিবি ,পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সব ধরনের পাচার রোধে আন্তরিক হয়ে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে পাচারকারীদের তালিকাও হয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে শিগগিরই পাচার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আসবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় যশোরের শার্শা ও বেনাপোল সীমান্ত চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দুই দেশের সীমান্ত ঘেঁষে এমনভাবে মানুষের বসবাস যে শনাক্ত করাই কঠিন কোনটা বাংলাদেশ আর কোনটা ভারত। এ সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা সহজে এপার-ওপার যাতায়াত করে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, মাদক পাচার রোধে বিজিবি কঠোর থাকলেও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ অতটা সতর্ক নয়। এতে অনায়াসে মাদক দ্রব্যসহ বিভিন্ন চোরাচালান পণ্য অনায়াসে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে।

বেনাপোল পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক শুকুমার দেবনাথ জানান, ‘সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে মাদকের বড় বড় চালান ঢুকছে দেশে। এতে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছি। প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী ও রাষ্ট্র আন্তরিক না হলে শুধু বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবের পক্ষে মাদক পাচার রোধ কঠিন।’

বেনাপোল  ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল জব্বার জানান, ‘যেহেতু দেশের অধিকাংশ মাদক বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে, তাই এ সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে বিজিবি, পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে।’সাদিপুর সীমান্তে জব্দ করা ফেনসিডিল

বেনাপোল ইউপি চেয়ারম্যান বজলুর রহমান বলেন, ‘আটক মাদক ব্যবসায়ীদের জামিন বিলম্বিত করা গেলে মাদকপাচার প্রতিরোধে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবে।’

বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি মামুন খান বলেন, ‘আমরা মাদকবিরোধী অভিযান ও মাদক উদ্ধার কার্যক্রম অভিযান অব্যাহত রেখেছি। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গডফাদার যেই জড়িত থাক, তাদের সঙ্গে কোনও আপস নয়। মাদক ব্যবসায়ীদের পক্ষে যে সুপারিশ করবে তাকেও ছাড় দেওয়া হবে না।’

যশোরের নাভারণ সার্কেল এএসপি জুয়েল ইমরান জানান, তারা ইতোমধ্যে মাদক পাচারকারীদের তালিকা করে আটক অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।

এ প্রসঙ্গে যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সেলিম রেজা জানান, ‘চোরাচালানের মূল হোতারা নিজেরা স্বর্ণ, অস্ত্র ও মাদকসহ চোরাই পণ্য বহন করেন না। এ কারণে তাদের হাতে নাতে আটক করা সম্ভব হয় না। তবে কোনও কোনও সময় বহনকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে মূল হোতাদের আটক করে জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ না থাকায় তারা জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়।’

উল্লেখ্য, যশোর এলাকায় ভারতের সঙ্গে ৭০ কিলোমিটার সীমান্ত পথ রয়েছে। সেখানে সীমান্ত রক্ষায় ও চোরাচালান প্রতিরোধে কাজ করছেন পাঁচ শতাধিক বিজিবি সদস্য। বিজিবি সীমান্তে নাইট ভিশন ক্যামেরা, ভাসমান বিওপি, নৌরুটে স্পিড বোটসহ বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করেছে।