কনকা ইলেকট্রনিক্সে আগুন

স্টোর রুমে দাহ্য কাঁচামালে আগুন লাগে, শ্রমিকরা ছিল টিফিন ব্রেকে 

 

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত কনকা ইলেকট্রনিক্স কারখানা থেকে সন্ধ্যার সময়েও ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। তবে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, দুপুরেই আগুন পুরোপুরি নিভে গেছে। আগুন আর ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নাই। তবে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়-ক্ষতি কত হয়েছে তা তাৎক্ষণিক নিরূপণ সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করবে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। ঘটনার সময় ২০০ থেকে ২৫০ কর্মী কারখানায় কাজ করলেও টিফিন ব্রেক থাকায় তারা আগেই কারখানার বাইরে বের হয়েছিল। ফলে কোনও শ্রমিক এই দুর্ঘটনায় আহত হননি। কেবল আতিকুর রহমান নামে একজন ইঞ্জিনিয়ার আগুন লাগার সময় ওপর থেকে লাফ দেওয়ায় আহত হন। তবে তিনি শঙ্কামুক্ত।

এর আগে রবিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল ১১টার দিকে কারখানার পূর্ব-উত্তর দিকের স্টোর রুমে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে স্টিল স্ট্রাকচার নির্মিত পুরো কারখানায়। আগুনে ভবনের দ্বিতীয় তলায় রাখা বিপুল সংখ্যক ফ্রিজসহ বিভিন্ন মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা থেকে আসা ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। 

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, কারখানার  স্টোররুমে বিপুল পরিমাণ  দাহ্য পদার্থ, কেমিক্যাল, প্লাস্টিক, প্লাস্টিকের সাদা দানা, তুলাসহ বিভিন্ন সামগ্রী থাকার কারণে আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

কনকা ইলেকট্রনিক্স কারখানায় লাগে ভয়াবহ আগুন

কারখানার শ্রমিকরা জানান, ‘কারখানায় ২০০-২৫০ জন শ্রমিক কাজ করতো। সকালে কাজে যোগদান করার পর সাড়ে ১০টার দিকে নাস্তা খাওয়ার বিরতির সময়ে এ আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। সেসময় শ্রমিকরা কারখানার বাইরে থাকায় হতাহতের আর কোনও ঘটনা ঘটেনি।’

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগীয় উপ-সহকারী পরিচালক দেবাশীষ বর্মণ জানান, বিশাল এলাকা  জুড়ে স্টিল স্ট্রাকচারের ওপর নির্মিত হয়েছে কনকা ব্রান্ডের রেফ্রিজেরেটর কারখানাটি। ‘কনকা ইলেকট্রনিক্সের কারখানা ভবনের  দ্বিতীয় তলার পূর্ব উত্তর কর্নারে ২য় তলায় ছিল স্টোররুম। ওই স্টোররুমে বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ রাখার স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ভবনে থাকা দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পরে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রথমে নিচতলার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও ২য় তলায় বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ মজুত থাকার কারণে ২য় তলার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকটা বেগ পোহাতে হয়েছে। দুপুর ২ টা নাগাদ কারখানাটিতে লাগা আগুন পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।’

কনকা ইলেকট্রনিক্সে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ফায়ার সার্ভিসের ব্রিফিং

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানার একজন কর্মকর্তা জানান, এই কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ১শ’ ফ্রিজ উৎপাদন হতো। কারখানার দ্বিতীয় তলায় উৎপাদিত ফ্রিজগুলো মজুত করে রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয় তলায় বিপুল সংখ্যক ফ্রিজ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিকুল ইসলাম জানান,‘দুপুর ২ টা নাগাদ টানা ৪ ঘণ্টার চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।’

তিনি আরও জানান, ‘অগ্নিকাণ্ডে কারখানার ভেতরে থাকা বিপুল পরিমাণ উৎপাদন করা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ (টাকায়) এখনও বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় কারখানার একজন ইঞ্জিনিয়ার আগুন লাগার পর দ্বিতল ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে তিনি শঙ্কামুক্ত রয়েছেন।

সোনারগাঁ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান,‘কনকা ইলেকট্রনিক্সের চারতলার সমান উঁচু দ্বিতল ভবনটিতে সকাল ১১টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে সাড়ে ৪ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন আনে।’ এই অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ মালামালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, পুলিশ ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করছে। যাতে মহাসড়কে যানবাহন আটকা না পড়ে।

কারখানার কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, কনকা ইলেকট্রনিক্সের এই ভবনটিতে টিভি, ফ্রিজ, ব্যাটারিসহ অন্যান্য জিনিসপত্র তৈরি করা হতো। এছাড়াও কারখানাটির ২য় তলায় বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই দাহ্য পদার্থ থেকেই আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে। তবে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।’

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগীয় উপ-সহকারী পরিচালক দেবশীষ বর্মন জানান, এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটিও আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবে। তাৎক্ষণিকভাবে আগুন লাগার কারণ বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বলা যাচ্ছে না। তবে কারখানাতে ফ্রিজ তৈরির জন্য বিপুল পরিমান প্লাস্টিক, প্লাস্টিকের দানা, দাহ্যপদার্থ ও রাসায়নিক দ্রব্য ছিল। এ কারণে আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এছাড়া ফ্যাক্টরির ভেতরে যে ফায়ার ফাইটিংয়ের ব্যবস্থা ছিল তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল । সেগুলো ব্যবহার করা যায়নি। কারাখানার সামনের অংশে গেইট নির্মাণ করার কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। ফ্যাক্টরি থেকে প্রায় ৫শ’গজ দূরের একটি পুকুর থেকে পানি পাইপ দিয়ে এনে এবং ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব উৎস থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

তিনি বলেন, তদন্ত করে দেখা হবে এই ফ্যাক্টরিতে ফায়ার প্লান অনুযায়ী ফায়ার ফাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে কিনা।