বগুড়ার আলোচিত সহিংসতা, ২০১৫

বগুড়া

গত বছরের শুরুতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে বগুড়ায় পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়ে পাঁচজন নিরীহ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা বছরজুড়েই ছিল আলোচনায়। এছাড়া, শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে বন্দুকধারীদের গুলিতে মুয়াজ্জিন নিহত, প্রলয়ঙ্করি ঝড়ে ১৮ ব্যক্তি মারা যাওয়া এবং কলেজছাত্রকে গলা কেটে  হত্যাসহ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে ওই বছরে।

জানা গেছে, গত বছরের ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় বন্দুকধারীরা বগুড়ার শিবগঞ্জের চককানু গ্রামে শিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন (৭০) নিহত হন। আহত হন ইমাম শাহিনুর ইসলাম, মুসুল্লি আবু তাহের ও আফতাব হোসেন। এ ঘটনায় মসজিদের কোষাধ্যক্ষ সোনা মিয়া শিবগঞ্জ থানয় অজ্ঞাত কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

পুলিশ জেএমবির গায়েরে এহসার সদস্য আনোয়ার হোসেন, মাদ্রাসা ছাত্র জুয়েল মিয়া ও একটি কওমী মাদ্রাসার পরিচালক শামসুল আলমকে গ্রেফতার করে। পুলিশ আনোয়ার ও জুয়েলকে সাতদিন করে এবং শামসুল আলমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও কোনও তথ্য বের করতে পারেনি। শিবগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) কামরুজ্জামান মিয়া ছাড়াও পুলিশের গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘটনা তদন্ত করছে।

ওসি কামরুজ্জামান মিয়া জানান, তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। হামলাকারীদের শনাক্ত করা গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখন কিছু বলা যাবে না। এ হামলার ঘটনায় গ্রেফতার ছয়জন জেলে আছেন। তবে অপর তিনজনের নাম তিনি প্রকাশ করতে রাজি হননি। পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডলও দাবি করেন, শিয়া মসজিদে হামলা মামলার তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। শিগগিরই রিপোর্ট পেশ করা হবে।  

শিবগঞ্জ থানার ওসি একেএম আহসান হাবিব জানান, শিয়াদের নিরাপত্তায় হরিপুর বাসস্ট্যান্ডে স্থাপিত পুলিশ ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। শিয়াদের মাঝে কোনও আতঙ্ক নেই।

গত বছরের ৬ জানুয়ারি থেকে জামায়াত-বিএনপি জোটের সরকারবিরোধী অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি শুরু হয়।  অব্যাহত অবরোধ ও মাঝে মাঝে হরতালে পিকেটার নামধারীদের সন্ত্রাসীদের পেট্রোলবোমায় ঝলসে পাঁচজন পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসায়ী নিহত হন। দগ্ধ হন ৩২ জন সাধারণ মানুষ ও ছয় পুলিশ সদস্য। এখনও অনেকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অর্ধশতাধিক গাড়ি পোড়ানো এবং ২৮টি ভাঙচুর করা হয়। ককটেল হামলা ছিল ৬৬টি। আর  পেট্রোলবোমা হামলা ছিল ১৩টি।

এসব ঘটনায় ৭১টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে জামাত-বিএনপির এক হাজার ৫০ জন নেতাকর্মীকে। পেট্রোলবোমা ও ককটেলসহ হাতেনাতে গ্রেফতার ২৯ জনের মধ্যে ৪ জন আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তারা গডফাদারদের নামও প্রকাশ করেছেন।

পেট্রোলবোমা সহিংসতায় নিহত হয়েছেন বগুড়ার শিবগঞ্জের বনতেঘড়ি গ্রামের পান ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম, ঝিনাইদহের শৈলকুপার শ্রীরামপুর গ্রামের ট্রাক হেলপার কলেজছাত্র এমরান হোসেন, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার পাঁচগাছি গ্রামের হেলপার হাসিবুল ইসলাম, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের আবদুর রহিম এবং বগুড়ার কাহালু উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের সাঈদ আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম জিলাদার। এদের মধ্যে রহিম ও জাহাঙ্গীর ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে মারা যান।

গত বছরের ৪ মার্চ রাতে বগুড়া শহরের ঝাউতলায় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আলহাজ মমতাজ উদ্দিনের ব্যক্তিগত অফিসে পেট্রোলবোমা হামলা চালানো হয়। আগুন নিভে যাওয়ায় তেমন ক্ষতি হয়নি। এর প্রতিশোধ নিতে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা শহরে নবাববাড়ি সড়কে জেলা বিএনপির অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।

গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় বগুড়ায় শহর ও আশপাশের উপজেলায় প্রলয়ংকরি ঝড়ে দেয়াল ও গাছ চাপায় এবং নৌকাডুবিতে নারী-শিশুসহ ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। আহত হন শতাধিক। শত শত ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। শুধু ফসলের ক্ষতি হয় ১৮ কোটি টাকার। নিহতরা হলেন আজিরন বিবি ও তার নাতনি নীলা (৩ মাস), রজব, পলাশ, আকালু, গোলাপী, মোস্তাফিজ, আব্দুল মান্নান, রাবেয়া বেওয়া, পায়েল ওরফে বুদা, সুজন, মোজাম আকন্দ, আজিজুল, ইসমাইল হোসেন, আফজাল হোসেন, ফিরোজা বেওয়া, আব্দুস সাত্তার এবং সামিয়া বেগম।

এছাড়া, গত বছর বগুড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে নববর্ষের উৎসব পালন করতে গিয়ে বাকীরুল্লাহ শেখ বিপ্লব (১৮) নামে বেসরকারি পলিটেকনিকছাত্র নিহত হন।  গলা কেটে ও কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। ১ জানুয়ারি সকালে বাড়ির কাছে শহরতলির ছিলিমপুর তালুকদার পাড়ার একটি বাগানে তার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশের দাবি দামি মোটরবাইক ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতেই ৬ বন্ধু তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। গ্রেফতার ৪ বন্ধুর মধ্যে তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।

/এমএসএম/এইচকে/